এবং পিপলি লাইভ

সত্যব্রত ঘোষ

 

১৯১৩ সালের ৩রা মে বোম্বের করোনেশন প্রেক্ষাগৃহে ‘রাজা হরিশ্চন্দ্র’ প্রথম জনসমক্ষে আসে। ধুঁধিরাজ গোবিন্দরাও ফালকে-র এই ৪০ মিনিটের নির্বাকচিত্রের মুক্তিকে চলচ্চিত্রের ইতিহাসকারেরা ভারতীয় চলচ্চিত্রশিল্পের উদ্বোধন হিসেবে নির্ণয় করেছেন। তাঁদের হিসেবমতো তাই ২০১৩ সালটিকে ভারতীয় চলচ্চিত্রের শতবর্ষ ধরে নেওয়া হয়। একশো বছরের এই কালসীমায় ভারতবর্ষ তথা সিনেমার প্রযুক্তির আমূল পরিবর্তন ঘটেছে। কিন্তু যা পাল্টায়নি, তা হল, সমাজের বিভিন্ন স্তরে ঘটতে থাকা দুর্নীতি এবং অবিচারের অবিচ্ছিন্ন ধারা। বাণিজ্যগত দিক থেকে উদারপন্থী হওয়া ছাড়া সরকারি দৃষ্টিভঙ্গিতে যে খুব একটা রদবদল ঘটেছে, তা বলা যায় না। এই পরিপ্রেক্ষিত থেকে দেখলে ভারতের চিত্রনির্মাণের প্রতিষ্ঠান এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিত্বরা সিনেমার পর্দায় তাঁদের শৈল্পিক অভিব্যক্তিকে যতই বিকশিত করুক, দিনের শেষে সেগুলির অধিকাংশের মধ্যেই বাণিজ্যিক প্রবৃত্তিই মুখ্য হয়ে উঠেছে। কারণ, আমাদের দেশে মনোরঞ্জনের অন্যতম মাধ্যম হিসেবে চলচ্চিত্র দীর্ঘ সময় ধরে স্বীকৃত।

কিছু ব্যতিক্রমী চিত্রনির্মাতা তখনও ছিলেন এবং হয়তো এখনও আছেন। বিনোদনের গণ্ডির মধ্যে আটকে না থেকে তাঁরা সিনেমার মাধ্যমে সামাজিক অন্যায় সম্পর্কে চেতনা বৃদ্ধি করতে চেয়েছেন। যেমন, ১৯৩৭ সালে নির্মিত ‘দুনিয়া না মানে’ ছবিতে আমরা ভি শান্তারামকে এই ছবির মূল চরিত্র গীতার মধ্যে দিয়ে বলিষ্ঠ এক স্বাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে দেখি। যার মাধ্যমে তিনি দর্শকদের স্পষ্ট বার্তা দিতে চেয়েছেন যে শুধুমাত্র পুরুষের ইচ্ছাপূরণের জন্যই নারীর জন্ম হয়নি।

নিখাদ শিল্পের প্রবক্তারা সিনেমার বাণিজ্যকরণকে বরাবরই সমালোচনা করে এসেছেন। তবে চলচ্চিত্রের অর্থনীতি সম্পর্কে যাদের অল্পবিস্তর ধারণা আছে, তাঁরা একথা মানেন যে শৈল্পিক পরিসর যতই সঙ্কুচিত হোক, ভারতীয় চলচ্চিত্রকারেরা সামাজিক বাস্তবতাবোধকে নিজেদের সাধ্য, সামর্থ, অভিজ্ঞতা এবং সচেতনতা নিয়ে পর্দায় ফুটিয়ে তোলবার চেষ্টা করেছেন। সম্প্রতি মুক্তিপ্রাপ্ত এ আর মুরুগাদস-এর তামিল ছবি ‘সরকার’ (২০১৮)-টিকেই ধরা যাক। মূলস্রোতের ছবির সব ‘ফরমুলা’ মেনেও মুরুগাদস নির্বাচনের প্রাক্কালে টাকা এবং অন্যান্য ভোগবস্তুর বিতরণের মাধ্যমে জনসাধারণের ভোট নিশ্চিত করবার অন্যায় প্রথাকে নিন্দা করবার সুযোগটিকে ভালোভাবে কাজে লাগিয়েছেন।

ভোটের প্রসঙ্গ যখন উঠলই, গুলজারের দুটি হিন্দি ছবির কথা বলতে হয়। ‘আঁধি’ (১৯৭৫) ছবিতে ভারতীয় রাজনীতিতে পরিবারতন্ত্রের আধিপত্যের অনুষঙ্গটিকে তিনি একটি জটিল দাম্পত্য সম্পর্কের মোড়কে অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে তুলে ধরেছিলেন। পরবর্তীকালে তাঁর ‘হু তু তু’ (১৯৯৯) ছবিটিতে মা এবং মেয়ের প্রবল সংঘর্ষের বিন্যাসটি তিনি এমন তীব্রভাবে রচনা করেন যে রাজনীতির দুর্বৃত্তায়নের সার্বিক চিত্রটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এখানে অবশ্য এটাও উল্লেখ থাক যে প্রযোজক ধীরাজলাল শাহের চাপে মূল ছবিটিকে ‘সহনীয়’ করে তোলবার জন্য গুলজারসাহেবের আপত্তি সত্ত্বেও যথেষ্ট কাটছাঁট করা হয়। তারপর তা সেন্সরের ‘অ্যাডাল্ট’ সার্টিফিকেট পায় এবং জনসমক্ষে আসে।   

সমাজ হোক বা রাজনীতি, তাঁর মূল উপাদান মানুষ। ভারতীয় চলচ্চিত্রে নাটকীয়তাকে প্রাধান্য দেওয়াটাই দস্তুর। তাই সাধারণ মানুষের জন্মজাত ভয়, অনিশ্চয়তা, দুর্বলতা ইত্যাদি নেতিবাচক দিকগুলিকে মুছে তাকে অতিমানুষ বানিয়ে নায়ক হিসেবে পর্দায় উপস্থাপন করতে হবে। এই উদ্দেশ্য নিয়েই প্রাতিষ্ঠানিক সব বাধ্যবাধকতা মেনে অধিকাংশ ছবি তৈরি হয়। অথচ স্বাধীনতা-পরবর্তী যুগে রাজ কাপুরের ছবিগুলিতে চার্লি চ্যাপলিনের ‘ট্র্যাম্প’-এর অনুকরণে সাধারণ মানুষের ইচ্ছা এবং আকাঙ্খাগুলিকেই উদযাপন করা হয়েছে। তবে, ‘মেরা জুতা হ্যায় জাপানি, পাৎলুন ইংলিসস্থানী ’-র উচ্ছাস মিটতে দেরি হয় না। এই ঘরানার একটি ছবি ‘আনাড়ি’ (১৯৫৯)-তে আমরা দেখি সাধারণ মানুষের সততাকে কাঠগড়ায় তুলতে রাষ্ট্র এবং সমাজব্যবস্থার বিন্দুমাত্র দ্বিধা নেই। চোরের বদনাম নিয়ে অভিযুক্ত মানুষটিকে অপেক্ষা করতে হয় ক্ষমতাবান ধনী ব্যক্তিটির জন্য। সততার নিদর্শন দিয়ে এই প্রতিপত্তিশালী ব্যক্তির সাক্ষ্যই তাকে আবার মুক্ত সমাজে ‘অবাধ’ বিচরণের ছাড়পত্র দেবে।  

অর্থ ও ক্ষমতার জোরে সব কিছু দখল করে নেওয়ার এই আগ্রাসী ব্যবস্থাটিকে সরাসরি নাকচ করবার তীব্রতম নিদর্শনটি আমরা গুরু দত্তের ‘পিয়াসা’ (১৯৫৭) ছবিটিতে পাচ্ছি। সেখানে এক কবিকে মৃত ধরে নিয়ে তাঁর কবিতাগুলিকেই নিজের নামে প্রকাশ করছেন প্রতিপত্তিশালী এক পুস্তক প্রকাশক। বইয়ের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে কবি সশরীরে ফিরে উপস্থিত সবাইকে প্রশ্ন করে “ইয়ে দুনিয়া আগর মিল ভি যায়ে তো কেয়া হ্যাঁয়?” শঠতা, মিথ্যাচারিতা, বিশ্বাসভঙ্গে পরিপূর্ণ এই কৃত্রিম দুনিয়াটাকে জ্বালিয়ে ধ্বংস করবার সোচ্চার আবেদন তাই শুধু এক রোমান্টিক কবির আর্তনাদেই সীমিত থাকে না। দেশ ও কালের সীমা অতিক্রম করে তা অন্যায়ের প্রতি সহনশীল এবং নির্ভরশীল মধ্যবিত্ত শ্রেণির সঙ্কুচিত মনোভাবকে ধিক্কার জানিয়ে যায়।

অথচ স্বাধীন দেশের নাগরিক হওয়ার মোহ কাটিয়ে দক্ষিণ ভারতে এই সময়েই দ্রাবিড় আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটছে চলচ্চিত্রের মাধ্যমে। মুত্থুভেল করুণানিধির তীক্ষ্ণ কলমে ‘পরাশক্তি’ (১৯৫২) হয়ে উঠছে দক্ষিণ ভারতীয় দর্শকসমাজে দ্রাবিড় সত্তার সূচিমুখ। কলাইগনার করুণানিধির লেখনী এবং পর্দায় শিবাজী গণেশন এবং পরবর্তীকালে এম জি রামচন্দ্রনের প্রবল উপস্থিতির কারণেই তখন জন্ম নিচ্ছে আঞ্চলিক রাজনীতির এক নতুন ধারা। জাতীয় প্রেক্ষাপটে প্রতিটি ক্ষমতাসীন এবং বিরোধী দল যার সঙ্গে ভবিষ্যতে সরাসরি সংঘর্ষে না গিয়ে সদাসর্বদা সমীকরণে আগ্রহী হয়ে থাকবে।

সামাজিক বিভাজন এবং জাতপাতের সমস্যায় দীর্ণ সাধারণ ভারতবাসী অর্থোপার্জনের ঘোর অসাম্য সত্ত্বেও দাঁতে দাঁত চেপে প্রতিদিনের লড়াই চালিয়ে যায়। ভারতীয় চলচ্চিত্রকারদের অধিকাংশই প্রত্যক্ষে এই সংগ্রামে নিয়ত থাকা সত্ত্বেও নিজেদের ছবিগুলিতে আকাঙ্ক্ষাপূরণের বার্তা দেন। এর কারণ, চলচ্চিত্র মাধ্যমকে জনমনোরঞ্জনের দিকে চালিত করলে আর্থিক স্বাচ্ছন্দ নিশ্চিত হয় এবং সামাজিক নিরাপত্তাও বজায় থাকে। তবুও, মনোরঞ্জকের ভূমিকা পালনের মধ্যেও আদর্শরক্ষা এবং বাস্তববোধের টানাপোড়েন অনুভব করছেন বিমল রায়, হৃষীকেশ মুখার্জি, বাসু চ্যাটার্জী, অরবিন্দ মুখার্জী, তরুণ মজুমদারদের মতো প্রমুখ কিছু চিত্রকার। নিজেদের ছবিতে যে পরিমিত রুচিবোধ এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার পরিচয় তাঁরা রেখেছেন, সাধারণ মানুষ তা দেখে তৃপ্তি পেয়েছে, সমৃদ্ধও হয়েছে। যাত্রিক পরিচালিত ‘কাঁচের স্বর্গ’ (১৯৬২) নামের বাংলা ছবিটিকে আমরা এই সচেতন বর্গের মূলস্রোতের চিত্রপরিচালকদের নির্মিতির প্রতিনিধিস্বরূপ দেখতে পারি। প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতিবিহীন এক তরুণের হাসপাতালের রোগীদের চিকিৎসায় নিবেদিত এবং বিবেকবোধে জর্জরিত হওয়ার গল্প বলা ছবিটি আজও আমাদের মনে দাগ কাটে।

গত শতকের ছয়ের দশকটির মধ্যভাগ থেকেই ইউরোপ এবং আমেরিকায় প্রতিষ্ঠান-বিরোধিতার সূত্রপাত। পুরুষতন্ত্রের মতো প্রাতিষ্ঠানিক রীতির বিরুদ্ধে নারী আন্দোলন, প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থায় হতাশ এবং ক্রুদ্ধ ছাত্র আন্দোলন, ভিয়েতনামে আমেরিকান সেনাবাহিনীর আগ্রাসী মনোভাবের বিরুদ্ধে শিল্পীসমাজের স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিবাদের প্রবল অভিঘাতে সাহিত্যের পাশাপাশি চলচ্চিত্রেও নতুন ভাষার জন্ম দেয়। ‘নিউ ওয়েভ’ চলচ্চিত্র ধারা ভারতবর্ষের চিত্রপরিচালকদের প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে নিজেদের চলচ্চিত্রে নতুন ভাষা প্রয়োগে উৎসাহী করে বটে। তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী ইতালির ‘নিও রিয়েলিজম’ যেভাবে সত্যজিৎ রায়, তপন সিংহ, বিমল রায়দের মতো প্রমুখ ব্যক্তিত্বদের বাস্তব ধারার চলচ্চিত্র নির্মাণে উদ্বুদ্ধ করেছিল, ‘নিউ ওয়েভ’ তুলনামূলকভাবে ভারতীয় চলচ্চিত্রকে কম প্রভাবিত করে। সম্ভবত তার কারণ, ভারতীয় চলচ্চিত্রে অন্তর্নিহিত আঙ্গিকের তুলনায় বাহ্যিক রূপের দিকে সাধারণভাবে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়ে থাকে। ‘নিও রিয়েলিজম’ চলচ্চিত্রকে ‘সুরক্ষিত’ কিন্তু কৃত্রিম ফিল্ম স্টুডিওর বাইরে বাস্তব প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে স্বাভাবিক আলোছায়ায় চলচ্চিত্রায়নের সাহস যোগায়। এই অগ্রগতির প্রায় দুই দশক পরে ‘কাহিয়ের দ্যু সিনেমা’ পত্রিকার লেখকদের প্রচলিত সিনেমাপদ্ধতির সমালোচনা থেকে জাত ‘নিউ ওয়েভ’ চলচ্চিত্রকে ভারতীয় চলচ্চিত্রকাররা মূলত ‘ফ্রিজ শট’, ‘জাম্প কাট’ জাতীয় কিছু কারিগরি প্রযুক্তির বাহ্যিকতার মধ্যেই সীমিত রেখে দেন। হয়তো তা এই কারণে, যে সমকালীন বাস্তবতার নিরিখে নতুন যে পাশ্চাত্য দর্শনের জন্ম ঘটে, তার সঙ্গে একাত্মীকরণে ব্যস্ত মানুষেরা ভারতীয় পরিপ্রেক্ষিতে মূল্যবোধের সংঘাত মেটানোর উপায়গুলির প্রতি ততটা যত্নশীল হননি। তবুও সরকারি আনুকূল্যে বানানো ‘ভুবন সোম’ (১৯৬৯) ছবিটিতে মৃণাল সেন সরকারি আমলাতন্ত্রের কৃত্রিমতা এবং নগরসর্বস্ব মানসিকতাকে যে বুদ্ধিদীপ্ত এবং শ্লেষপূর্ণ দৃষ্টিতে তুলে ধরবার স্পর্ধা দেখিয়েছিলেন, তা আজও অতুলনীয় মনে হয়। তপন সিংহের ‘আপনজন’ (১৯৬৮) ছবিটি এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য হয়ে ওঠে। কারণ, শিক্ষিত যুবসমাজের বেকারত্বের জ্বালাকে এমন দ্ব্যর্থহীন ক্রোধ নিয়ে এর আগে পর্দায় ফুটে উঠতে দেখেনি ভারতীয় সিনেমা।

পরবর্তী দশকে আমরা তরুণ অমিতাভ বচ্চনকে রাগতে দেখব বটে, কিন্তু তা কখনওই তাৎক্ষণিকতা অতিক্রম করে নতুন কোনও রাজনৈতিক বোধের জন্ম দেয় না। হয়তো এইখানেই ‘কলাইগনার’-এর সংবেদী কলমের সঙ্গে চিত্রনাট্যকার জুটি সেলিম-জাভেদের বাণিজ্যপ্রধান চিন্তার মূল প্রভেদ। ‘মেরে পাস মা হ্যাঁয়’ জাতীয় সংলাপের মাধ্যমে যেখানে সচেতনভাবে মূল্যভেদের ভারসাম্যকে প্রাতিষ্ঠানিকতার দিকে ঠেলে দেওয়া হয়। সব হারানোর যন্ত্রণার পরেও যেখানে অনেক কিছু ফিরে পাওয়ার প্রতিশ্রুতি থাকে মনে হয়। ১৯৮০ সালে সৈয়দ মির্জা নির্দেশিত ‘অ্যালবার্ট পিন্টো কো গুসসা কিউ আতা হ্যাঁয়’ ছবিটি এই ভারসাম্য রক্ষাকেই প্রশ্ন করে।

সাতের দশকের এম এস সথ্যুর ‘গরম হাওয়া’ (১৯৭৪) এক অভূতপূর্ব ছবি। এখানে আমরা দেখি, ধর্মভিত্তিক ভেদ-বিভেদে কণ্টকিত ভারতবর্ষের শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির একটি মুসলিম পরিবার স্বাধীনতা-পরবর্তী ভারতবর্ষে কেমনভাবে স্বাতন্ত্র এবং আভিজাত্য খুইয়ে সর্বহারা হচ্ছে। এই মর্মগাথার ক্রমিক বিবরণে যে মানবিক দলিল পর্দায় সৃষ্টি হয়েছে, তা আজকের মেরুকরণের রাজনীতির বিরুদ্ধে এক সক্ষম অস্ত্র হিসেবে গণ্য হওয়া উচিৎ। এই ছবিতেও আমরা রাগের বহিঃপ্রকাশ দেখছি। কিন্তু অনুভব করতে পারছি যে সেই রাগ পুঞ্জীভূত শোকের থেকেই জন্ম নিয়েছে। যে শোকের সঙ্গে আমাদের আগেই পরিচয় ঘটেছে ঋত্বিক ঘটকের ‘মেঘে ঢাকা তারা’ (১৯৬০) এবং সুবর্ণরেখা (১৯৬৫) ছবিদুটির মাধ্যমে। যেখানে দেশবিভাগের যন্ত্রণাকে চিত্রপরিচালক মহাকাব্যিক রূপ দিয়ে আমাদের ইতিহাস চেতনার অন্তর্ভুক্ত করতে সক্ষম হয়েছেন।

***

মূলত বিনোদনের উদ্দেশ্যে সিনেমা বানানো হয় ভারতে। দর্শকদের আশাপূরণ করাটাই তার প্রধান কাজ। কিন্তু দর্শক হিসেবে আমরা এটাও প্রত্যাশা করি যে নতুন কিছু অনুভূতির সঙ্গে হয়তো আমাদের পরিচয় ঘটবে। অচেনা জায়গা, অজানা মানুষ, সম্পর্ক ও পরিস্থিতির নতুন কোনও গিঁট। যখন তা ঘটে, বহু ক্ষেত্রে দর্শকের সত্তা ভুলে যাই আমরা। আত্মীয়তার বন্ধনে জড়িয়ে গিয়ে তাদের সুখদুঃখে অংশীদার হই। স্বল্পকালের জন্য। কিন্তু তার রেশ রয়ে যায়। যেভাবে রয়ে যায় টেলিভিশন অথবা সোশ্যাল মিডিয়ায় সঞ্চারিত সংবাদ ও তথ্যের ভিত্তিতে রচিত কিছু চেনা ব্যক্তির অজানা দিকগুলি জানবার অভিঘাত। এমন কিছু নতুন অনুভবকে নিয়ে আবার আমরা নিজেদের পরিচিত বৃত্তে ফিরি। দৈনন্দিন জীবনে রক্তমাংসের যে মানুষগুলির সাহচর্য আমাদের অভ্যাস, যাদের স্পর্শ, গন্ধ এবং গতিবিধি আমাদের নখদর্পণে, যারা আমাকে চেনে অনেকটা আমার মতো করেই, তাঁরা কিন্তু ঐ নতুন অনুভবগুলির শরিক হন না। এভাবে একটু একটু করে অপরিচিত হতে থাকি অন্যের চোখে। কিছু দুর্লভ মুহূর্তে এই নতুন স্বরূপটির আত্মপ্রকাশ ঘটে। চমকে উপলব্ধি করি চারপাশের পৃথিবীটা অনেক পাল্টেছে।

৬ই ডিসেম্বর ১৯৯২-কে যদি আমরা একটি মাইলফলক হিসেবে দেখি, তাহলে বলা যেতে পারে মেরুকরণের প্রবণতাটিকে ক্ষমতাসীন কংগ্রেসের রাজনীতি এবং সংস্কৃতি দীর্ঘ এক সময় ধরে ব্যক্তিপূজা এবং জাতীয়তাবাদের ধুয়ো তুলে প্রশমিত রাখতে সমর্থ হয়েছিল। চোরাস্রোত ছিল। যেমন, নানা পাটেকরের ‘প্রহার’ (১৯৯১) ছবিতে তোলা দুটি জরুরি প্রশ্ন : দেশ-এর নামে আমরা কি নদী-নালা-পর্বত-ক্ষেত ইত্যাদিকেই রক্ষা করব? দেশে যারা বাস করে, সেই মানুষগুলি কি আদৌ নিরাপদ? হিংস্র এক প্রেক্ষাপট নির্মাণ করে নানা প্রশ্ন দুটি ছুঁড়ে দিয়েছিলেন আমাদের দিকে। ছবিতে মেজর চৌহান একটি কিলিং মেশিনে পরিণত হয়। তারপর আসামীর কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে উক্ত প্রশ্ন দুটি বিচারকের দিকে ছুঁড়ে দেয়। বিচারকের রায়টিও বিস্ময়জনক। “সমাজের খারাপ দিকগুলি দেখবার পর মেজর চৌহানের মনে গভীর আঘাত লেগেছে। সরকারি মানসিক হাসপাতালে ছয়মাস তাঁর চিকিৎসা পর পর্যবেক্ষণের শেষে তাঁর ‘মেজর’ পদটি নিয়ে সসম্মানে সামরিক বাহিনীতে ফিরে যাবেন।” অর্থাৎ, আইন যে সবার জন্য এক হয় না, তা এই ছবিতে স্পষ্টভাবে বলা হল। এবং ছবির শেষে স্বপ্নদৃশ্যে উন্মুক্ত প্রান্তরে নগ্ন শিশুদের সামরিক প্রশিক্ষণে মেজর চৌহানকে ফিরে আসতে দেখে অশুভ এক সংকেত পৌঁছায় মস্তিষ্কে। সামরিক প্রতিষ্ঠান, উগ্র দক্ষিণপন্থী রাজনীতি এবং চিত্রপ্রযোজনায় অর্থ বিনিয়োগকারী মাফিয়া গোষ্ঠীর সমীকরণটি ‘প্রহার’-এর মাধ্যমে কিছুটা স্পষ্ট হয় পরবর্তীকালে। যখন করসেবকরা বাবরি মসজিদ ধ্বংস করে উল্লাসে মাতে এবং বোম্বে (১৯৯৫ থেকে যার ‘মুম্বাই’ নামান্তর হয়) শহরে একের পর এক বোমা বিস্ফোরণ কাণ্ডের সঙ্গে দাউদ ইব্রাহিমের নাম যুক্ত হয়।

টিনু আনন্দের ‘শাহেনশাহ’ (১৯৮৮) ছবিটির নায়ক প্রথম থেকেই উপলব্ধি করছে পুলিশের উর্দি গায়ে থাকলে সমাজবিরোধীদের শায়েস্তা করা যাবে না। সে তাই ঘুষ নেয়, অপরাধীদের প্রশ্রয় দেয়। আর রাতের অন্ধকারে শাহেনশাহ নাম নিয়ে এক যোদ্ধার আবরণে সজ্জিত হয়ে অপরাধীদের ধরে পেটায়। সমান্তরাল এক আইন ও বিচারব্যবস্থার উদ্ভবের এই পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণে দর্শক চমৎকৃত। অর্থাৎ, ছবির যে প্রেমাইজ, তার প্রতি সন্দেহ করবার কোনও অবকাশ চিত্রনির্মাতা দিচ্ছেন না। চিত্রনাট্য রচনার কৌশলকে মাথায় রেখে বলা যেতে পারে, চরিত্রের ব্যাকস্টোরি এতটাই ‘জবরদস্ত’ যে সমব্যথী দর্শকদের আচরণে নায়কের হীনতম কার্যাবলীও ধিক্কারের যোগ্য বলে মনে হয় না। মূলস্রোতের ভারতীয় ছবিতে নায়কদের গায়ে একটু ধুলো লাগলেই দর্শককুল বিচলিত হয়। তাদের শরীরে রক্ত ফুটে উঠলে আমাদের মনেও প্রতিশোধপরায়ণতা জাগে। (রক্তপাতের দৃশ্যে প্রধান চরিত্রকে সাদা পোশাক পরাবার প্রথাটির দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।) অন্যায়ের বিনাশ ঘটাতেই হবে। আমাদের এই আকাঙ্ক্ষাকেই পর্দায় পূরণ করে নায়ক সুপারস্টার হয়। এতে অন্যায়বোধটি যদি আপেক্ষিক হয়, পরোয়া নেই।

সমস্যাটা এখানেই। সাধারণ মানুষদের মতোই অধিকাংশ চিত্রনির্মাতা সমাজের অবনমনে পীড়া অনুভব করেন। কিন্তু সেই তাগিদ থেকে তাঁরা যখন সিনেমা মাধ্যমটিকে ব্যবহার করবার কথা ভাবেন, তখন তাঁদের মানসিকতায় ব্যবসায়িক দিকটি ক্রমশ প্রাধান্য পেতে থাকে। সকল শ্রেণির দর্শকদের মধ্যে থেকে নির্ধারণ করা হয় লঘিষ্ঠতম হর (lowest denominator)-টি। যাবতীয় শোষণ, বঞ্চনা এবং অত্যাচার এভাবেই উপস্থাপিত করা হয় যে তার বিরুদ্ধে প্রতিশোধের ইঙ্গিতগুলি যেন নায়কের আচরণে ও সংলাপে স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। শেষে যখন সে ‘বদলা’ নেবে তখন তা যেন অন্যায়ের সঙ্কেত না দেয়। দিলেও সামাজিক এবং আইনি দৃষ্টিতে তা যেন গ্রাহ্য হয়।

বস্তুত, গত শতাব্দীর আটের দশক থেকে ভারতীয় বাণিজ্যিক সিনেমায় একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটে। তা হল, অ্যান্টি-হিরো বা প্রতিনায়কের চরিত্রগুলিকে প্রাধান্য দেওয়ার প্রবণতা। এই ধারাটির মাধ্যমে যে প্রতিবাদী চরিত্রগুলি সৃষ্টি হল তারা প্রায় জন্ম থেকেই সমাজের অসাম্য ও আইনব্যবস্থার ত্রুটিগুলিকে দেখে আসছে। সেই অন্যায়গুলির সঙ্গে দর্শকদের আগে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়। এর ফলে প্রতিনায়ক কোনও বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে যখন সেই একই অন্যায়গুলি পর্দায় অন্যের প্রতি করে, সে কিন্তু আর দর্শকদের বিরাগভাজন হয় না। বরং তার শারীরিক অথবা পারিবারিক কোনও ক্ষতি দেখানো হলে, দর্শকদের মধ্যেও এক ধরনের প্রতিশোধস্পৃহা তৈরি হয়। যা চরিতার্থ হয় যখন প্রতিনায়কের তাণ্ডবলীলায়। সিনেমায় অর্থ বিনিয়োগে যে বোম্বের অসংখ্য সমাজবিরোধীর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে, তা এই দুই দশকের মূলধারার হিন্দি, তামিল এবং তেলেগু ছবি দেখলে বোঝা যায়। যার প্রতিনিধিস্বরূপ আমরা ‘বাজিগর’ (১৯৯৩), ‘জেন্টেলম্যান’ (১৯৯৩) প্রভৃতি ছবিগুলিকে দেখতে পারি। সমস্যা হল, প্রচলিত সমাজব্যবস্থার বিরুদ্ধে কথা বললেও এবং প্রতিনায়কের চরিত্রে ধূসর স্তরগুলিকে প্রতিষ্ঠিত করা হলেও ছবিগুলিতে খলনায়ককে আমরা সাধারণত পৌরাণিক কংস চরিত্রটির মতো একমাত্রিক দেখি। কৃষ্ণের মতো প্রতিনায়ক তাকে শাস্তি দিলেই যেন জনগণের সব ক্রোধের উপশম ঘটে।

মণি রত্নমের তামিল ছবি ‘নায়কন’ (১৯৮৭)-এ আমরা দেখেছি ভেলু নামে সাধারণ বস্তিবাসীটি পুলিশ ইন্সপেক্টর রতন সিংকে নির্মমভাবে হত্যা করে জনগণের চোখের মণি হয়ে উঠছে। কুখ্যাত এক সমাজবিরোধী হয়ে ওঠার পর্বটি এমনভাবে পর্দায় ফুটিয়ে তোলা হয় যেন আমরা এক নায়কের জন্মবৃত্তান্ত দেখছি। তুলনামূলকভাবে সেলিম-জাভেদ যখন দিওয়ার (১৯৭৫) রচনা করেন, সেখানে প্রতিনায়কের সমাজবিরোধী হয়ে ওঠবার সমান্তরালে তাকে প্রতিহত করবার জন্য শক্তিও সমাহিত করা হচ্ছিল পার্শ্বনায়কের। সামাজিক বাস্তবতা উপস্থাপনের পাশাপাশি চিরায়ত মূল্যবোধের উদযাপনকে একটি স্বাভাবিক প্রবৃত্তি হিসেবে মনে করা হত তখন। এর এক দশকের কিছু পরে মণি রত্নম তাঁর ছবির একেবারে শেষে তা পোয়েটিক জাস্টিস হিসেবে আমাদের মনে করিয়ে দেন। রতন সিং-এর মানসিক প্রতিবন্ধী ছেলেটি যখন বন্দুকের গুলিতে ভেলু নায়কনকে হত্যা করে।

অথচ দর্শকের আকাঙ্ক্ষা পূরণের এই কাঠামোটিকে প্রায় অস্বীকার করে গোবিন্দ নিহালনির ‘অর্ধসত্য’ (১৯৮৩) মুক্তি পায়। সেখানে কুখ্যাত সমাজবিরোধীকে আইনগত শাস্তি দেওয়ার ক্রিয়াটি পুলিশকর্মী ভেলংকরকে একজন অপরাধীতে পরিণত করে।    

এই সময়টিতেই তপন সিংহ বানালেন ‘আদালত ও একটি মেয়ে’ (১৯৮২)। যা অন্যান্য ছবির মতো ধর্ষকামী চোখে নারীর লাঞ্ছনাকে দেখছে না। ভারতবর্ষে ধর্ষণসংক্রান্ত মামলায় অত্যাচারিত নারীদের কাঠগড়ায় নতুন করে যে মর্যাদাহানির পর্বটি সহ্য করতে হয় তার বাস্তব চিত্রটি শুধু দর্শকসাধারণের সামনেই নয়, নীতি-নির্ধারকদের সামনে অত্যন্ত পীড়াদায়ক রূপে তুলে ধরে ছবিটি।

ভারতবর্ষের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিকও কিন্তু এই সময়ের কিছু ছবিতে উঠে আসে। তা হল সরকারি প্রতিষ্ঠানে বয়স্ক নাগরিকদের প্রতি অবহেলার যে মানসিকতা সাধারণভাবে প্রচলিত   তার চিত্রায়ন। ‘তাবারানা কাথে’ (১৯৮৬) নামে গিরীশ কাসারাভাল্লির কন্নড় ছবিটি নিরুচ্চারে কিন্তু অত্যন্ত কার্যকরী রূপে এই নির্বিকার নিষ্ঠুরতাকে নিন্দা জানায়। অন্য মর্মস্পর্শী ছবিটি হল শাজী করনের মালয়ালাম ছবি ‘পিরাভি’ (১৯৮৯)। পুলিশের গুলিতে নিহত এক রাজনৈতিক কর্মীর বৃদ্ধ পিতা যেখানে নিজের সর্বস্বটুকু উজার করে মৃত সন্তানের হদিশ জানতে পুলিশের কাছে, রাজনৈতিক দলের দপ্তরে বারবার ফিরে আসে। মহাশ্বেতা দেবীর ‘হাজার চুরাশির মা’-এর মতো। উপন্যাসটি অবলম্বনে গোবিন্দ নিহালনির ছবি (১৯৯৮)-তেও এই যন্ত্রণা ফুটে ঊঠেছে।   

***

নতুন শতাব্দীর চিত্রনির্মাতাদের প্রমুখ অংশটি কিন্তু আর ভাবের ঘরে চুরি করতে রাজি নয়। তা বোঝা যায় রাকেশ ওমপ্রকাশ মেহরার ‘রং দে বাসন্তী’ (২০০৬) ছবিটিতে। বিমানবাহিনীতে পুরনো মিগ ২১-গুলি ব্যবহারের চক্রটি যে রাজনৈতিক মদতপুষ্ট, তা আমরা সংবাদপত্র পড়ে আগেই জেনেছি। ছবিতে তার সমীকরণটি বিশ্বস্তভাবে তুলে ধরেছেন পরিচালক। এর সমান্তরালে পরাধীন ভারতবর্ষের অনুষঙ্গটি এনে তিনি দর্শকদের স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছেন যে কুচক্রী শাসক এবং মুনাফালোভী ব্যবসায়ীদের পারস্পরিক বোঝাপড়ার ট্র্যাডিশন স্বাধীনতা পরবর্তী কালেও দিব্যি বহাল আছে।

দেশ এবং দেশের মানুষদের থেকে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলি ক্রমশ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে। নির্বাচন আসন্ন হলে ক্ষমতাসীন প্রার্থীরা বিভিন্ন কাজের ফিরিস্তি দিয়ে নিজেদের জনদরদী ভাবমূর্তি টিঁকিয়ে রাখবার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যায়। নির্বাচনে জেতবার পরেই কিন্তু তাদের মনে পড়ে ভোট প্রচারে যে ব্যবসায়ীরা টাকা বিনিয়োগ করেছিল, তাদের কথা। জনগণের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতির চেয়ে এই ব্যবসায়ী সংস্থাগুলিদের কাছে দেওয়া শর্তগুলি পালন করবার প্রতিই ক্ষমতাসীন নেতাদের সম্পূর্ণ মনোযোগ। সরকারি আমলাবর্গ প্রাণপণে স্থিতাবস্থা কায়েম রাখতে ব্যস্ত। সাধারণ মানুষের অভাব-অভিযোগের দিকে কারওই নজর নেই। সম্প্রতি সারা ভারত জুড়ে যে কৃষক আন্দোলন চলছে, তা প্রমাণ করে উৎপাদক শ্রেণিভুক্ত বৃহত্তর কৃষকসমাজের প্রতি সরকারের যতটুকু দায় থাকা উচিৎ ছিল, তার অনেকটাই অধিকার করে আছে মধ্যস্বত্বভোগীরা। অনুশা রিজভি নির্দেশিত ‘পিপলি লাইভ’ (২০১০) ছবিটি ভারতের এই বাস্তব চিত্রটিকে শ্লেষাত্মক ভঙ্গিতে তুলে ধরে। ঋণখেলাপের দায়ে নিলাম হওয়া জমির মালিকের আত্মহত্যার ঘোষণা সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরগুলিতে এবং প্রচারমাধ্যমে এক অভূতপূর্ব তৎপরতা সৃষ্টি করে। এই চাঞ্চল্যের কৃত্রিমতা দেখে সাধারণ দর্শকদের ধারণা দৃঢ়বদ্ধ হয় যে জনকল্যাণে নিবেদিত সরকারি প্রকল্পসমূহ খাতায় কলমে পাকাপোক্ত হলেও তা কার্যকরী করতে যে আন্তরিক ইচ্ছার প্রয়োজন তার একান্ত অভাব। পিপলি গ্রামে লাইভ কভারেজ করতে আসা সম্প্রচারকদের তাড়নাও যে মানবিক তা বলা যায় না।

‘পিপলি লাইভ’ ছবিটি প্রথমবার দেখে মনে হয়েছিল সমাজ পরিবর্তনের যে চেতনায় বিমল রায় ‘দো বিঘা জমিন’ (১৯৫৩) বানিয়েছিলেন, সময়ের সঙ্গে তাল রেখে সেই বিবেক এবং রাজনৈতিক বোধের বিবর্তন ঘটেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক কৃষক আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে ছবিটি আবার দেখতে দেখতে মনে হল, বর্তমান চিত্রনির্মাতারা সাধারণভাবে মেনেই নিচ্ছেন নির্বিকার সাধারণ মানুষের জন্য নির্মিত সিনেমাগুলির দ্বারা সমাজ পরিবর্তন সম্ভব নয়। বরং এই জীর্ণদীর্ণ ব্যবস্থার ফাঁকফোকরগুলিকে ব্যবহার করে ছবি বানানোটা বুদ্ধিমানের পরিচয় হবে দুটি উদ্দেশ্য সাধনের জন্য : এক, বাইরে থেকে আসা এক পর্যবেক্ষকের দৃষ্টি দিয়ে কেন্দ্রীয় চরিত্র ও অন্যান্যদের দ্বারা সৃষ্ট ঘটনার দ্বন্দ্বকে সিনেমায় তুলে ধরা, এবং দুই, বিষয়বৈচিত্রে নতুনত্ব এনে নিজেদের কেরিয়ার সুপ্রতিষ্ঠিত করা। পরবর্তীকালে অমিত মাসুরকরের ‘নিউটন’ (২০১৭)-এও যা আমরা দেখেছি। যেখানে এক তরুণ সরকারি চাকুরেটি ‘মাওবাদী’ এলাকার অধিবাসীদের ভোটপ্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করানোর আন্তরিক প্রচেষ্টাটি শ্লেষাত্মক ভঙ্গিতেই উপস্থাপিত হয়।

সিনেমানির্মাণ বরাবরই একটি বাণিজ্যিক ক্রিয়াকর্ম। সেখানে লাভক্ষতির অঙ্ক কষবার হিসেব-রক্ষক এবং ভালো-মন্দ পরামর্শদাতার একেবারেই অভাব নেই। এর মাঝে তবুও চৈতন্য তামহানের মতো এক তরুণ উজ্জ্বল ব্যতিক্রম হয়ে আসে তাঁর মারাঠি ছবি ‘কোর্ট’ (২০১৪) নিয়ে। এসে সব হিসেব এলোমেলো করে দিয়ে সে পরবর্তী ছবির জন্য হন্যে হয়ে আজও প্রযোজক খুঁজে বেড়ায়।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 952 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

1 Trackback / Pingback

  1. দ্বিতীয় বর্ষ, অষ্টম যাত্রা : চলচ্চিত্রচঞ্চরী — ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*