ভারতীয় সিনেমায় নবতরঙ্গ : জন্ম ও মৃত্যু

চণ্ডী মুখোপাধ্যায়

 

প্যারাডাইম শিফট। সম্প্রতি হলিউড ক্রিটিক অ্যাসোসিয়েশনেরর সৌজন্যে দিন দশেকের হলিউডকে খুব কাছের থেকে দেখার সু্যোগ পেলাম। আবিষ্কার করলাম হলিউড পালটাচ্ছে। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে হলিউডে কিন্তু এর আগে এইরকম পরিবর্তন আরও বেশ কয়েকবার এসেছে। সেগুলো এসেছে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অন্যান্য মাধ্যমের সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকার তাগিদেই। কিন্তু এবারে চোখের সামনে যে পালটে যাওয়াটা দেখলাম সেটা কিন্তু ঠিক সেইরকম নয়। বরং এটার মধ্যে যতটা না বাণ্যিজিক, তার চেয়ে অনেকটাই বেশি শিল্পগত। সমস্ত হলিউডে বদল হয়েছে এমন নয়। কিন্তু কিছু চলচ্চিত্র করিয়েদের হাতে তৈরি হয়েছে হলিউডের মধ্যেই আরেক ছোট হলিউড। যাকে বলা যেতে পারে অন্য ধারার হলিউড। হলিউড ঘরানার বাইরে গিয়ে এঁরা কম বাজেটের অন্যরকম ছবি তৈরি করেন। যেমনটা ঘটেছিল একদা ভারতে। বোম্বাই মাদ্রাজ টালিগঞ্জ ইত্যাদিদের চ্যালেঞ্জ জানিয়ে কিছু তুর্কি পরিচালক উঠে আসেন। তাঁদের হাতেই তৈরি হয় ভারতীয় নবতরঙ্গ। এই ধারার পাইওনিয়র হিসেবে ভাবা হয় মৃণাল সেনের ‘ভুবন সোম’-কেই। যদিও সত্যজিৎ রায় ‘ভুবন সোম’-কে নবতরঙ্গের ছবি হিসেবে মেনে নিতে রাজি ছিলেন না। কিন্তু ভারতীয় সিনেমার নবতরঙ্গ-কে তিনি মেনে নেন। ষাটের দশকে যেমন একদল তরুণ ফরাসি সিনেমায় দারুণ এক পরিবর্তন আনেন। যা কিছু পুরনো সব কিছুকে বাতিল করে সিনেমা তৈরিতে নিয়ে আসেন এক নতুনতর ভাবনা। এই নবতরঙ্গের নেতৃত্ব দেয় ফরাসি সিনেমার পঞ্চপাণ্ডব— জঁ লুক গোদার, ফ্রাঁসোয়া ত্রুফো, এরিক রোমার, ক্লদ শ্যাব্রল এবং জ্যাকুইস রিভেত। এদের পাশে আরও কয়েকজন ছিলেন। সেই ফরাসি নবতরঙ্গের কথা মাথায় রেখেই মনে হয় সত্তর দশকের এই নতুন ধারার নাম হয় ইন্ডিয়ান নিউ ওয়েভ। ষাটের দশকের শেষে মৃণাল সেনের ‘ভুবন সোম’ নিয়ে আসে ভারতীয় সিনেমায় এক নতুন ধারা। খুব কম টাকার বাজেটে প্রকরণ ও আঙ্গিকে এক অন্যতর ভাবনা নিয়ে। কতটা এর মধ্যে নবতরঙ্গের চিহ্ন আছে কতটা নেই সে প্রশ্ন অন্য। সে বিচার করেছেন সত্যজিৎ। তার নিরিখে ‘ভুবন সোম’ নবতরঙ্গের শুরু করেনি। ভারতীয় সিনেমায় নবতরঙ্গ এসেছে শ্যাম বেনেগালের ‘অঙ্কুর’ ছবি থেকে। সত্যজিৎ কিন্তু ভারতীয় সিনেমার কোনও পরিচালকের সঙ্গে কখনও বিতর্কে জড়াননি। ব্যতিক্রম মৃণাল সেন। ‘আকাশ কুসুম’ ছবির সময়েও সত্যজিৎ ডিসকোর্সে মেতেছিলেন মৃণালের সঙ্গে। বোঝা যায় মৃণাল সেনের প্রতি সদা সতর্ক নজর রাখতেন তিনি। সেইসব বিতর্ক থাক। ষাটের দশকের শেষের দিকে মৃণাল বেশ ভালোভাবেই প্রভাবিত হন ফরাসি নবতরঙ্গের আইক্লোনোক্লাস্ট জঁ লুক গোদারের সিনেমার প্রকরণে। বিশেষ করে সত্তর দশকে মৃণালের রাজনৈতিক ছবি ‘কলকাতা ’৭১’, ’ইন্টারভিউ’ থেকে ‘কোরাস’ এইসব ছবিতে সরাসরি গোদার-আঙ্গিক প্রভাব স্পষ্ট। ভুবন সোম-এ ন্যারেশন ছিল কিন্তু তার পরের কয়েকটি ছবিতে মৃণাল সরাসরি ন্যারেশন বর্জন করলেন। তাঁর নিজের কথায়, “ফ্রাগমেন্ট অফ ফিজিক্যাল রিয়েলিটি-কে নিয়ে আমি আমার ইচ্ছেমত একটা শেপ দিয়েছি। টুকরো টুকরো বাস্তব ছবি ও শব্দ জোগাড় করেছি, জুড়েছি নিজের ইচ্ছেমত, নিজের ইচ্ছেমত একটা পৃথিবী তৈরি করেছি। তারপর নিজস্ব লজিক আমদানি করেছি, অরগানাইজ করতে, বক্তব্যকে শক্ত করতে।” মৃণালের এইসব কথা সন্দেহহীনভাবে গোদার-ভাবিত। তবে মৃণাল কিন্তু নিজের ক্ষমতা এবং প্রতিভার জোরেই গোদার আঙ্গিক-এর ভারতীয়করণ করেন।

ষাটের দশকেই সরকারি আনুকূল্যে তৈরি হয় ফিল্ম ফিনান্স করপোরেশন বা এফ,এফ,সি। এই এফ,এফ,সি শুরুতেই যে তিনটে ছবি প্রযোজনা করে— ভুবন সোম, মণি কাউলের ‘উসকি রোটি’, এবং বাসু চ্যাটার্জির ‘সারা আকাশ’। সন্দেহহীনভাবে এই তিনটি ছবি ছিল ব্যতিক্রমী প্রয়াস। এবং ভারতীয় সিনেমায় অন্যধারার সিনেমার সূচনাপর্ব তখনই। এর পরেই ভারতীয় সিনেমায় আসে নিউ ওয়েভ বা নতুন ধারা, যাই বলা যাক না কেন। বোম্বাই মাদ্রাজ টালিগঞ্জের প্রভৃতির বিরুদ্ধে ভালো ছবিকরিয়েদের পাল্টা চ্যালেঞ্জ। ওদিকে যেমন উঠে এলেন বি বি করন্থ, গিরিশ কারনাড, পট্টভি রামা রেড্ডি, আর টি এস নাগাভরণ, আদুর গোপালকৃষ্ণন, বাসুদেবন নায়ার, শ্যাম বেনেগাল, সৈয়দ মির্জা, জি অরবিন্দন, মুজাফফর আলি, কেতন মেহতা, গোবিন্দ নিহালনির মতো পরিচালকেরা তেমন আবার বাংলায় এলেন বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত, নব্যেন্দু চট্টোপাধ্যায়, গৌতম ঘোষ, উৎপলেন্দু চক্রবর্তী, অপর্ণা সেন ও আরও  অনেকে। বাংলা সিনেমা তথা ভারতীয় সিনেমায় এল সমান্তরাল ভাল ছবির ধারা।

কিন্তু ক’দিন? ভালো ছবির ধারা কেন হারিয়ে গেল সেই সমান্তরাল ছবির স্রোত। সত্যিই কি সব হারিয়ে গেছে? আসলে বোম্বাই আর ভারতীয় ছবির রেফারেন্সেই ভারতীয় ছবি সম্পর্কে শেষ কথা বলে ফেলি। জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে বিচারক হয়ে যাওয়ার সুবাদে বলিউড বা টলিউডের বাইরে অন্তত শ’খনেক অন্য ধারার ছবি দেখার সুযোগ হয়। সেখানে এমন কিছু ছবি দেখার সু্যোগ হয় যা দেখে ভারতবর্ষের সিনেমা সম্পর্কে আশাবাদী হতেই হয়। ঠিকই বাঙালিদের কাছে এসব নামগুলো খুব পরিচিত নয়। সেটা তাঁদের দোষ নয়। দোষ বাঙালিদের ক্রমশ কুয়োর ব্যাঙ হয়ে ওঠা। কিন্তু ভারতীয় নবতরঙ্গের পরিচালকেরা এভাবে হারিয়ে গেলেন কেন?

৫০ বছরেই সব শেষ? ৫০ কেন? বছর ২০ পরেই তো সমঝোতার শুরু। অন্য ধারার ছবি থেকে ক্রমশই মূল ধারায় মিশে যাওয়া। এফ,এফ,সি থেকে তৈরি হল এন,এফ,ডি,সি বা ন্যাশানাল ফিল্ম ডেভলপমেন্ট করপোরেশন। সেই সরকারি আনুকূল্যতেই। বাংলায় এল বামফ্রন্ট। তারা সিনেমা তৈরি করার জন্য টাকা দিতে শুরু করল। কোনওদিন যাদের সিনেমার সঙ্গে যোগাযোগ ছিল না তারাও পার্টির সাপোর্টে হয়ে উঠলেন ফিল্ম মেকার। ওদিকে এন,এফ,ডি,সি-তে ঢুকে পড়ল দুর্নীতি। যারা এইসব সরকারি পয়সায় ছবি করলেন তারা পয়সা ফেরত দেবার প্রয়োজন বোধই করলেন না। খুব স্বাভাবিক সরকারি আনুকূল্য বন্ধ হল। আর ভারতীয় নতুন ধারার পরিচালকেরা চলে এলেন মূলস্রোতের সিনেমায়। সকলে নয়, তবে চলে যাওয়ার দলটাই ভারি। কেননা কম বাজেটে ছবি করার অভ্যেস এবং প্রযোজককে টাকা ফেরৎ দেওয়ার অভ্যেস তাঁদের অনেকদিনই নষ্ট করে দিয়েছে সরকার এবং রাজনীতি। ফলে বাংলা সিনেমার এইরকম এক নষ্ট সময়ে যা হবার তাই হয়েছে। সিরিয়াল আর বাংলা সিনেমায় কোনও ভেদ নেই। টি ভি-ই এখন বাংলা সিনেমার মুক্তির পথ। মোক্ষও বলা যায়। বাংলা সিনেমা কখনও সেন্টু-নির্ভর কখনও বা যেন মিউজিক ভিডিও।

সিনেমা নির্মাণের সু্যোগ সুবিধা অনেক বেড়ে গেছে। সিনেমা তো এখন আর রাসায়নিক কোনও প্রক্রিয়া নয়, বরং তা ইলেক্ট্রো-ম্যাগনেটিক। ফিল্ম নয়, চিপ। সিনেমা নির্মাণের জন্যে আর বড় বড় ক্যামেরা, বিশাল বিশাল রিল ভর্তি ফিল্মের দরকার পড়ে না। মোবাইলের সিম-কার্ড সদৃশ একটা চিপই যথেষ্ট। ঐ চিপের ভেতরেই পুরো একটা ২০, ২২, ৩২ বা আরও আরও বেশি রিলের ছবি ঢুকে যায়। পরিবেশনা এবং প্রদর্শনের ক্ষেত্রেও এখন পথ অনেক সহজ। স্যাটেলাইট প্রক্রিয়াকে কাজে লাগিয়ে পৃথিবীর যে কোনও প্রান্তে পাঠিয়ে দেওয়া যায় যে কোনও ছবি। ভালো ছবিকরিয়েদের ক্ষেত্রে এ তো সুখের সময় হওয়ার কথা ছিল। বিশ্বের অনেক দেশেই তা হয়েছে। যেমন নিজের চোখেই তো দেখে এলাম খোদ হলিউডে। হলিউডের মধ্যে অন্য হলিউড। যেখনে নতুন করে শুরু হয়েছে সিনেমার সহজ পাঠ। ডিজিটাল প্রয়োগ সেখানে অস্ত্র।

 

 

হুইলার্স স্টল । দ্বিতীয় বর্ষ, দশম মেল ট্রেন

  • Hindutwa or Hind Swaraj
About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1097 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

1 Trackback / Pingback

  1. দ্বিতীয় বর্ষ, অষ্টম যাত্রা : চলচ্চিত্রচঞ্চরী — ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*