আরবিআই গভর্নর উর্জিতের পদত্যাগ : কারণ অনুসন্ধান

পরঞ্জয় গুহ ঠাকুরতা

 

এই লেখাটির জন্য আমরা লেখক এবং নিউজক্লিকের কাছে কৃতজ্ঞ। নিউজক্লিকে গত ১০ই ডিসেম্বর প্রকাশিত পরঞ্জয়বাবুর বক্তব্যের ভিডিওটি লেখার নিচে দেওয়া হল।

কী বলবেন একে? যবনিকাপতন? ভারতের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষিতে আচমকাই এক অশনি সংকেত? নাকি স্রেফ সরকারি স্তরে স্বাধীনতাহরণ এবং তজ্জনিত পদস্খলনের সামগ্রিক ইতিহাসের একটুকরো ছবি? ডক্টর উর্জিত প্যাটেল পদত্যাগ করলেন। দ্বিতীয় ঘটনা হিসেবে। নেহেরু কেবিনেটে অর্থমন্ত্রক এবং আরবিআই গভর্নরের মতপার্থক্যের কারণে গভর্নরের পদত্যাগের অনেক বছর পর আরেকটি অনুরূপ দৃষ্টান্ত। এবার উর্জিত। প্রধানমন্ত্রীর ভাষায় ‘থরো প্রফেশনাল, ইম্পেকেবল ইন্টেগ্রিটি, ইকোনমিস্ট উইথ হাই ক্যালিবার’। মাইক্রোইকোনমিক্সে গভীর প্রজ্ঞা। অথচ সব বিশেষণ উল্টে এক নাটকীয় পটপরিবর্তন। অবশ্য এক দিক থেকে দেখতে গেলে আচমকা নয়। একটা টেনশন ছিলই। গত কয়েকমাস ধরে চলার পর যার পরিসমাপ্তি ডক্টর প্যাটেলের পদত্যাগের মধ্যে দিয়ে। পাঁচ রাজ্যে ভোটের ফলাফলের ঠিক মুখেই।

কী হতে পারে এর ফলে? নতুন কেউ আসবেন? কথাটা সেখানে নয়। বাজারে ধ্বস নামবে? ধ্বস যদিও নেমেছে, কিন্তু প্রকৃত সমস্যাটি সেখানে নয়। দেশের প্রধান ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থার সর্বপ্রধান অঘোষিত সরকারি হস্তক্ষেপের প্রতি এক ধরনের বিরক্তি এবং অভিমানের সূত্রেই ছেড়ে দিলেন পদ। সরকারের ভাবমূর্তি, দেশের ভাবমূর্তি, এক্ষেত্রে কিছুই রক্ষিত হল না।

কোথায় শুরু টানাপোড়েনের? এস. গুরুমূর্তি। সরকারের তরফে নবনিযুক্ত। ব্যাঙ্কের সেন্ট্রাল বোর্ড অফ ডিরেক্টরেটের সদস্য। রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সেবক সংঘের অন্যতম ধ্বজাধারী। দলীয় ‘স্বদেশী জাগরণ মঞ্চ’ ইত্যাদির আহ্বায়ক। সেই গুরুমূর্তি। গভর্নরের পদত্যাগের ঘটনা যার কাছে ‘শকিং’। কারণ, কিছুদিন আগের মিটিংগুলিতেও উর্জিতের স্বাভাবিক উদ্যম, কাজ, ভবিষ্যৎ চিন্তাধারা। এই পদত্যাগের কোনও চিহ্নমাত্র নাকি ছিল না উর্জিতের চোখে মুখে। ব্যাঙ্কের কেন্দ্রীয় বোর্ডের অন্যান্য সদস্যারা যথারীতি দোষ খুজছেন মিডিয়ার, যারা নাকি গন্ধ ছড়াচ্ছে অকারণেই ভীষণ পরিষ্কার একটি ছোট্ট ঘটনার ওপর। পদত্যাগ, হতেই তো পারে, তাই না? অন্তত উর্জিত যেখানে জানিয়েছেন ‘ব্যক্তিগত কারণে পদত্যাগ’।

কিন্তু কথা হল, উর্জিত, খোদ প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করেছেন বেশ কয়েকবার। বরফ গলার, গলানো যদি যায়। চেষ্টা করেছেন। ফল হয়নি।

কারণ? এক এক করে বাড়তে থাকা টেনশন। কেন? কবে থেকে? শুরু থেকেই শুরু করা যাক।

এক। বেশ কিছু প্রম্পট কারেক্টিভ অ্যাকশন। ব্যাঙ্কগুলির ক্ষেত্রে। সরকার এবং আরবিআই-এর মধ্যস্থতায় যা একধরনের বাধ্য হয়েই নেওয়া (যা এখন বোঝা যাচ্ছে), তা অধিকাংশই ব্যাঙ্কগুলি এবং সামগ্রিক ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থার বিরুদ্ধে গেছে। বিশেষ করে, পাবলিক সেক্টর ব্যাঙ্কগুলির ক্ষেত্রে যার ফল একেবারেই ভালো হয়নি। অন্তত উর্জিত তাই মনে করছেন।

দুই। আরবিআই-এর পক্ষ থেকে সরকারি এক্সচেকারে যে অর্থ যায়, তার উপর কেন্দ্রীয় হস্তক্ষেপ। এবং তা লাগাতার। সরকারি কারণ হিসেবে যদিও এই অর্থ সরবরাহের পদ্ধতিতে রিস্ট্রাকচারিং ইত্যাদি কথা বলা হলেও সরকারের সমালোচনায় উঠে আসে ব্যাঙ্ককে লাগাতার সরকারি চাপ। যার ফল হিসেবে প্রায় বাধ্য হয়েই আরও বেশি করে অর্থ যোগান দিতে বাধ্য হয় আরবিআই। শুধু তাই নয়, এ ব্যাপারে, সরকারের তরফে আরবিআই অ্যাক্টের সেকশন থ্রি-কে মনে করিয়ে দিয়ে তার কঠোর রূপায়ণের কথা বলা হয়। একধরনের কথা শোনানো, বা শাসানির মতো লাগছে না? অন্তত সেই ক্ষেত্রে তো লাগছেই যেখানে তিরিশের দশকে এই অ্যাক্টের প্রণয়নের পর থেকে সেকশন খুঁজে খুঁজে দায়িত্ব মনে করিয়ে দেওয়ার কাজ করতে হয়নি আগের কোনও সরকারকে।

তিন। তার সাথে বহু আলোচিত পাওয়ার কোম্পানিগুলির নন-পারফর্মিং অ্যাসেট। বিশেষ করে সেই পাওয়ার কোম্পানি, যার সঙ্গে আদানি, এসার বা টাটাদের নাম জড়িত। শোধ না করা অর্থকে নন-পারফর্মিং অ্যাসেট বা স্ট্রেসড ফাইনান্সিয়াল অ্যাসেট বলে দেওয়ার ব্যাপারে সরকারি স্তরে টালবাহানা। আরবিআই-এর পক্ষ থেকে বারবার আদালতে যাওয়া এবং কেবিনেটের দ্বারস্থ হওয়া। যদি নন-পারফর্মিং অ্যাসেট হিসেবেই ভাবা যায়, তাহলে প্রোমোটার বা ব্যাঙ্কগুলির হাত থেকে সেই অর্থের নিয়ন্ত্রণ বেরিয়ে ইনসলভেন্সি এবং ব্যাঙ্করাপ্টসি কোডের অধীনে ন্যাশনাল কোম্পানি লোন ট্রাইব্যুনালের আওতায় চলে যাওয়ার কথা। অথচ, মজার কথাটা হল, আরবিআই-এর নিজের চাওয়া সেরকমই কিছু মিটিং যখন কেবিনেট সেক্রেটারি পিকে সিনহা ডেকেছিলেন, আরবিআই-এর একজন বোর্ড সদস্যও উপস্থিত ছিলেন না। গোপন তথ্য থেকে পাওয়া খবর অনুযায়ী উপস্থিত আরবিআই গভর্নরের ব্যবহারও যথেষ্ট অস্বস্তিকর ছিল।

চার। সরকারের তরফে এমএসএমই বা ক্ষুদ্র এবং মাঝারি শিল্প সংস্থা সংক্রান্ত বেশ কিছু প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে, যার ফলশ্রুতি হিসেবে এস গুরুমূর্তির প্রস্তাব ছিল আরবিআই কি তার আইন এবং কাজকর্মকে একটু শিথিল করে এমএসএমই-দের আরেকটু বেশি ক্রেডিটের ব্যবস্থা করতে পারে না? এবং এই ব্যাপারেও উর্জিতের সঙ্গে মতভেদ।

এসব কিছুই একটা দিকে ইঙ্গিত করে। সিবিআই-এর পর আরবিআই। এক এক করে স্বশাসিত বলে জারি করা দেশীয় সর্বোচ্চ পর্যায়ের সংস্থাগুলির ক্রমশ সরকারের পুতুলে পরিণত হওয়া। এবং তাদের কর্তাব্যক্তিদের ওপর তৈরি হওয়া ক্রমবর্ধমান চাপ সামলাতে না পেরে এবং কিছুটা আত্মমর্যাদা কারণে ক্রমশ গুটিয়ে নেওয়া।

নতুন কোনও গভর্নর আসবেন। যাবেন। কিন্তু বাকি বিশ্বের কাছে সহনশীল ভারতবর্ষের কোনও ভাবমূর্তি আর থাকছে কি?

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1180 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*