তিনটি কবিতা

অবন্তিকা পাল

 

একটি বিচ্ছেদ থেকে…

দেখি তার গলার ভিতর থেকে এক টুকরো রুদ্ধশ্বাস
উঠে আসে বাতাসে।
যেসব দূরত্বের কাছে আমি তীব্র অসহায়
তার পায়ে ফেলে ফেলে আসি স্থিতি, তরঙ্গ,
সম্পর্কের অভিধামালা

তবে এইখানে স্থান দাও। হে বটবৃক্ষ
নুয়ে পড়া শাখার আরামে হেলান দিয়ে
সূর্যাস্ত দেখি কিয়ৎকাল।
মুহূর্তই যদি হবে
তবে বিলম্বিত-বন্দিশের আগে কেন এ দীর্ঘ আলাপ-চারিতা?

দেখি তার শুভ্র বল্কলের নিচে ত্বক
তারও নিচে পাঁজর আর
অচিন পাখিটি খুব যন্ত্রণায় ডানা ঝাপ্টায়
ওকে তুমি ফল দাও,
নিতান্ত দু’চারবেলা জল
অথচ শেষের শেষের পরে
যেখানে শুরুর ইঙ্গিত —

দ্যাখো, সেই রাতের আকাশ জুড়ে পূর্ণগ্রাস গ্রহণ ছেড়ে গিয়ে
কী হুলস্থূল হাওয়াই না দিচ্ছে আজ!

 

চৈত্র : নির্নিমেষ

তারপরে বিকেল হয়-হয়।

পশ্চিমের জানলা দিয়ে কাঁপা কাঁপা হলুদ, রাধাচুড়ো গাছ বেয়ে সাদা পর্দায় এসে নামে। টিউব ল্যাম্প জ্বলে ওঠে এ ঘরে সে ঘরে গুটিকয়। তুমি আমার সামনে বসে থাকো। হাতের নাগালে। তোমার আলুথালু পাঞ্জাবির গায়ে ঘরোয়া রোদ্দুর এসে লাগে। লাগে অন্ধকার। সাজানো সন্ধেটুকু লাগে। নরম মুখের দিকে চেয়ে আমি প্রহর পাল্টানোর রং দেখতে পাই। আর যে ধূসর, পলকে লেগে থাকে — ইচ্ছে যায়, দুহাতে আবছায়া মেখে মুছিয়ে দিই সব — অথচ কী আশ্চর্য, দু’কলি গেয়ে উঠতে উঠতে দুইজোড়া চোখ ফের জলে জল

আজ থেকে একে অন্যকে ভালো রাখব তবে? দুজনে দুজনকে দেব আলোর শুশ্রূষা? এ জন্ম, সে জন্মান্তর, যেখানেই দেখাশোনা হোক, প্রিয় হও, সখা হও, বন্ধু, রহো,

রহো রহো… সাথে…

 

চেতনা

দু’দণ্ড বসি তারপর, তোমাদের লিলিফুল গাছের কোল ঘেঁষে
এখন সময় বড় স্তব্ধ
রাত্রি দ্বিতীয় প্রহরে ওদের সবেবরাতের মিছিল
সশব্দে শহরের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে যায়
মন্দিরে জাগ্রত হয় বুদ্ধপূর্ণিমার ঘণ্টাধ্বনি
কেবল দুজনে আমরা চুপ করে থাকি, মুহূর্তকে আঙুলে জড়িয়ে

মধ্যে মধ্যে কেন যে কান্না পায় কে জানে
ছুটে যাই ইশারাবিহীন
ফিরতি পথের অজুহাত পিঠে ক’রে
সম্পর্ক থেকে সম্পর্কে ছলনাক্লান্ত তবু বিগতশোক,
প্রত্যাশা শেষ হলে তারও পরে ফেলে রেখে যায় ঘুম

আমি ঘুমিয়ে পড়ব বলে তোমার কোলের কাছে বসি
অন্ধকার এসে হাত রাখে অবিন্যস্ত চুলে
এও এক নিজেকে আবিষ্কার
আলদোনসার ছেঁড়া স্কার্টের ফ্রিলে মাথা ফুঁড়ে ওঠে বিরহকাতর রাত
নাচতে নাচতে তারার দিকে হাত বাড়ায় ঝিলমিল
সে দোলায় গানের আদর দিতে দিতে, কথার চুম্বন দিতে দিতে
তুমি হয়ে ওঠো লামাঞ্চার শতাব্দীপ্রাচীন প্রেমিক

তখনই এ পৃথিবীর মধ্যে আমরা সন্ধান পেয়ে যাই
অন্য এক ধরিত্রীর
ভয়হীন, প্রতিহিংসাবিহীন
যাবতীয় অসম্ভবের স্বপ্নে মশগুল, দুর্নিবার
আমি দুলসিনেয়া
তুমি যোদ্ধা নির্ভীক — প্রিয় ডন কিহোতে আমার

 

 

 

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1180 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*