যুবরাজ ও বঙ্গললনা

স্বাতী মৈত্র

 

১৮৭৬ সালের ড্রামাটিক পারফরম্যান্সেস অ্যাক্টকে ভারতীয় নাট্যমঞ্চের ইতিহাসে একটি কালা কানুন বলেই আমরা আজ জানি। স্বাধীনতার পরেও সেই আইন সহজে বিদায় হয়নি। ১৯৫৩ সালে ইন্ডিয়ান পিপলস থিয়েটার অ্যাসোসিয়েশনকে (ইপটা) পশ্চিমবঙ্গ সরকারের হাতে নবান্ন ও নীল দর্পণ সহ পঞ্চাশটা নাটকের স্ক্রিপ্ট তুলে দিতে বলা হয়। ব্যান হয় নীল দর্পণ, গোরা, বিসর্জন, মহেশের মতন নাটক। দেশের নানান প্রান্তে ইপটার আরও কর্মীকে হেনস্থার মুখে পড়তে হয়। নাট্যকর্মীদের দীর্ঘ আন্দোলনের পরে পশ্চিমবঙ্গে শেষমেশ এই আইন ১৯৬২ সালে রদ করা হয়।

এ হেন কালা কানুনের ইতিহাসে একটি ছোট্ট অধ্যায় আছে, যা আজ ইতিহাসের বইয়ে সেইভাবে চর্চা হয় না। এই কাহিনীতে চরিত্র হিসেবে রয়েছেন স্বয়ং মহারানী ভিক্টোরিয়া ও তাঁর সুপুত্র যুবরাজ অ্যালবার্ট এডওয়ার্ড ওরফে বার্টি (পরবর্তী কালে রাজা সপ্তম এডওয়ার্ড), রয়েছেন উনিশ শতকের কলকাতার তাবড় তাবড় ধনী ও গুণীজন, রয়েছে সেই সময়ের নানান সংবাদপত্র ও পত্রিকা। উনিশ শতকের কলকাতার ‘দলাদলি’ ও ধনাঢ্যদের ক্ষমতার লড়াই (যাঁদের অনেককেই আমরা বাংলার নবজাগরণের প্রাণপুরুষ বলে মনে করি), নারীমুক্তি বনাম ট্র্যাডিশন, মায় একখানা ছোটখাট রাজকীয় স্ক্যান্ডাল এবং সেডিশন অথবা রাজদ্রোহ— এই সমস্ত উপাদান মিলিয়ে এই কাহিনী।

***

আমাদের কাহিনীর শুরু সুদূর বিলাতে, খোদ ইংল্যান্ডের রাজপরিবারে। কেন্দ্রে মহারানি ভিক্টোরিয়া ও যুবরাজ বার্টি। তা তিনি যতই পরাধীন ভারতের সম্রাজ্ঞী হন না কেন, ভিক্টোরিয়া ও তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র (সব ছেলেমেয়ের মধ্যে দ্বিতীয় সন্তান) বার্টির সম্পর্কের টানাপোড়েন ধারাবাহিক উপন্যাসকে হার মানিয়ে দেয়।

ইতিহাসের ও সমাজতত্ত্বের বইয়ের পাতায় অনেক সময়েই ভিক্টোরীয় নৈতিকতা নিয়ে আলোচনা হয়ে থাকে, যা কিনা নেহাতই রক্ষণশীল। সেই রক্ষণশীলতা চাপিয়ে দেওয়া হয় ভারতবর্ষের সমাজে। অশ্লীলতার দায়ে পড়তে হয় বাংলার সং ও যাত্রাকারদের, পাঁচালিকার ও কবিয়ালদের। এক অংশের বাঙালি সমাজসংস্কারকেরও এর প্রতি প্রচ্ছন্ন সমর্থন ছিল। তবে ভিক্টোরীয় নৈতিকতার টানাপোড়েন যে ব্রিটিশ রাজপরিবারের অন্দরমহলেও ছিল, সে কথা শুনে অবাক লাগতেও পারে। এর অনেকটা কারণই ভিক্টোরিয়ার পূর্বসূরি তৃতীয় জর্জ (ঠাকুরদা) এবং চতুর্থ উইলিয়ামের (জ্যাঠা) আমলে রাজপরিবারের গুরুত্বপূর্ণ পুরুষ সদস্যদের লাগামছাড়া বাবুগিরি। ইংরেজ ঐতিহাসিকরা ভিক্টোরিয়ার কাকা-জ্যাঠাদের একের পর এক কেচ্ছার ইতিহাস মাথায় রেখে তাঁদের নাম দিয়েছেন “Victoria’s wicked uncles”। এ হেন পরিবারের মেয়ে ভিক্টোরিয়া শেষ পর্যন্ত জার্মানির সাদামাটা যুবক অ্যালবার্টের (অবশ্যই ইনিও রাজপুত্র) সাথে আলাপ ও বিয়ে হওয়ার পর যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন। অ্যালবার্ট স্বেচ্ছাচারী তো ছিলেনই না, বরং তাঁর সমাজ ও নৈতিক সংস্কারের প্রতি ঝোঁক তথাকথিত ভিক্টোরীয় নৈতিকতার ধারণা গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। রাজপরিবারের প্রতি জনসাধারণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে তৎপর অ্যালবার্ট ও ভিক্টোরিয়া সমাজের সামনে নিজেদের উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরবার উদ্যোগ করেছিলেন, নৈতিকতার শাসনে বেঁধেছিলেন তাঁদের নিজের পরিবারকেও। ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়া ও নীতিশিক্ষা কেমন করে হবে, তার দায়ও ভিক্টোরিয়া আর অ্যালবার্ট উনিশ শতকের আদর্শ পিতা-মাতার মতন নিজেদের হাতে তুলে নিয়েছিলেন। এই নৈতিকতার শাসনের সবথেকে বড় অধীন ও সবথেকে বড় ব্যর্থতা, দুই-ই যুবরাজ বার্টি।

যুবরাজ অ্যালবার্ট এডওয়ার্ড ও রাজকুমারী আলেজান্দ্রা, ১৮৬০এর দশকে। তিনি কলকাতায় ১৮৭৫ সালে এলেও তার অনেক আগে থেকেই “অ্যালবার্ট ফ্যাশনে” চুল আঁচড়ানো কলকাতায় অভিজাত যুবকেরা অভ্যাস করেছিলেন।

যুবরাজ বার্টিকে নিয়ে ভিক্টোরিয়া আর অ্যালবার্টের চিন্তার সীমা ছিল না। বড় মেয়ে ভিকির মতন মাথা চলে না বার্টির, অন্যান্য ছেলেমেয়েদের মতন নির্ঝঞ্ঝাটও নয় বার্টি। যত তাকে আলাদা করে যুবরাজ-সুলভ শিক্ষা দিয়ে ভবিষ্যৎ শাসক হওয়ার যোগ্য করে তুলবার চেষ্টা করেন ভিক্টোরিয়া ও অ্যালবার্ট, ততই বাবা-মার আশায় জল ঢেলে দিত বার্টি। সে যে নেহাতই অযোগ্য, সে যে একেবারেই বাবা-মাকে হতাশ করেছে, এ কথাও বার্টিকে ছোটবেলা থেকেই বার বার বুঝিয়ে দিতেন তাঁরা। অতএব বার্টি তার পূর্বপুরুষদের পথেই হাঁটবে, এ আর আশ্চর্য কী? রেসের মাঠ থেকে জুয়া ও শিকার, লন্ডনের নামীদামীদের সাথে ওঠাবসা, সব কিছুতেই বার্টি পারদর্শিতা দেখায়। ১৮৬১ সালে, যখন বার্টির বিয়ের কথা ভাবছেন তার বাবা-মা, সেই সময়েই সে জড়িয়ে পরে নেলি ক্লিফডেন নামক এক অভিনেত্রীর (মতান্তরে দেহব্যবসায়ী) সাথে।

ক্লিফডেন ও বার্টির কথা জানতে পেয়ে মর্মাহত হন নীতিবাগীশ অ্যালবার্ট। ছেলেকে চিঠি লিখে অনুযোগ করেন, একবারও বাবার কাছে পরামর্শ চাইতে আসেনি কেন বার্টি? তিনি তাহলে তখনই তার জন্য একজন সুযোগ্য পাত্রীর ব্যবস্থা করে দিতে পারতেন! তা না এক অভিনেত্রীর ন্যায় নিম্নশ্রেণির মহিলার সাথে… ছিঃ ছিঃ ছিঃ!

বার্টি ক্ষমা চায় বাবার কাছে, কিন্তু ক্ষমাপ্রার্থী হওয়া সত্ত্বেও তার বাকি বন্ধুদের— যারা নেলির সাথে তার দেখা করবার ও গোপনে সময় কাটানোর ব্যবস্থা করে দিয়েছিল— নাম বলতে রাজি হয় না সে। আবার চিঠি লেখেন অ্যালবার্ট— মধ্যপন্থা বলে কিছু হয় না! তোমাকে এই জীবনে হয় ভালো নয় মন্দ হয়েই বাঁচতে হবে!

এরপরের সপ্তাহে অ্যালবার্ট নিজেই কেমব্রিজে চলে আসেন ছেলের সাথে দেখা করতে। রাত একটা অবধি বাবা-ছেলের “ম্যান টু ম্যান” কথা হয়, শোনা যায় তিনি ক্ষমাও করে দেন বার্টিকে। কিন্তু এরপর উইন্ডসরে ফিরতে ফিরতেই দেখা যায় যে অ্যালবার্টের শারীরিক অবস্থা বিশেষ সুবিধার নয়। কিছুদিন টাইফয়েড জ্বরে ভোগবার পরে মৃত্যু হয় তাঁর।

অ্যালবার্টের শারীরিক অবনতি ও মৃত্যুর জন্য বার্টিকে দায়ী ঠাওরান শোকাহত ভিক্টোরিয়া। বাবার মৃত্যুশয্যায় শোয়ার খবর পর্যন্ত পাঠাননি তিনি ছেলেকে— শেষমেশ বোন অ্যালিসের পাঠানো একটি টেলিগ্রাম পেয়ে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ছুটে আসে বার্টি।

বার্টিকে ক্ষমা করেননি ভিক্টোরিয়া। একের পর এক চিঠিতে বড় মেয়ে ভিকিকে লিখেছেন, বার্টি অ্যালবার্টকে অতটা কষ্ট দিয়েছে বলেই শেষরক্ষা হয়নি। বলেছেন, আমি ওর দিকে তাকালেও আমার বুকের ভিতরটা কেমন যেন ছ্যাঁৎ করে ওঠে। ডেনমার্কের রাজকুমারী আলেজান্দ্রার সাথে বার্টির বিয়ে দেওয়ার পর তাদের বৈবাহিক জীবনে বার বার নজরদারি ও হস্তক্ষেপ করেছেন ভিক্টোরিয়া, আবার ততদিনে প্রাপ্তবয়স্ক ও বিবাহিত হওয়া সত্ত্বেও বার্টি নিজের জীবনযাত্রায় বিন্দুমাত্র রাশ টানবার প্রয়োজন মনে করেননি। বার্টির জীবনের এই দিক ভিক্টোরিয়া মেনে না নিলেও আলেজান্দ্রা মেনে নিয়েছিলেন! শুধু কী তাই? যুবরাজ যাতে রাজ্যপাটের দেখভালে বেশি জড়িয়ে না পড়েন, তার ব্যবস্থা করতেও সদা সচেষ্ট ছিলেন ভিক্টোরিয়া। ১৮৯০ সাল পর্যন্ত তিনি সরকারি নথিপত্র দেখবার অনুমতি পর্যন্ত দেননি বার্টিকে! মা-ছেলের সম্পর্কের চাপানউতোরে দুই দিক সামলে চলবার গুরুদায়িত্ব অনেক ক্ষেত্রেই পালন করতে হত প্রধানমন্ত্রী ডিসরায়েলিকে, ও পরবর্তীকালে প্রধানমন্ত্রী গ্ল্যাডস্টোনকে!

রাজপরিবারের এ হেন নাটকীয় সম্পর্কের টানাপোড়েন অথবা যুবরাজের চারিত্রিক সুনাম সম্পর্কে পরাধীন ভারতের প্রজারা কতদূর খবর রাখতেন? বাবুয়ানি ও সমাজ সংস্কারের হুজুগে মেতে ওঠা কলকাতায় সেই নিয়ে কেমনই বা মত ছিল? লন্ডন থেকে খবর যে একেবারেই এসে পৌঁছত না সে কথা জোর দিয়ে বলা শক্ত, যদিও সে সময়কার সংবাদপত্র বা পত্রিকায় তার উল্লেখ খুব একটা পাওয়া যায় না। কোম্পানির আমল থেকেই ভারতীয় প্রেসের সাথে কোম্পানি বাহাদুরের সম্পর্ক অনেকটা নির্ভরশীল ছিল ব্যক্তি গভর্নর জেনারেলের ভারতীয় প্রেস সম্পর্কে মতামতের উপর। ওয়েলেসলির মতন কেউ কেউ কড়া হাতে প্রেসের রাশ টেনে রাখতেন, আবার মেটকাফের মতন কেউ কেউ প্রেসের প্রসার হতে দিতেন। ১৮৫৭-র বিদ্রোহ ও কোম্পানি যুগ অবসান হওয়ার পর থেকে চিত্র অনেকটা বদলে যায়— লর্ড ক্যানিং তাঁর কুখ্যাত গ্যাগিং অ্যাক্ট ১৮৫৮তে তুলে নিলেও ভারতীয় প্রেসের উপর সরকারি নজরদারি বজায় ছিল। হয়তো সেই কারণে, অথবা হয়তো নেহাতই নব্যনিযুক্ত ব্রিটিশরাজের মন যুগিয়ে চলতে চাওয়ার কারণে সে সময়কার খবরের কাগজ বা পত্র-পত্রিকার পাতায় ইংরেজ রাজপরিবারের কেচ্ছা নিয়ে বিশেষ কিছু মতামত দেখা যায় না (যদিও অমৃতবাজার পত্রিকা এ কথা লক্ষ করতে ছাড়েনি যে খোদ ইংল্যান্ডে রাজতন্ত্রের বিরোধী সেই সময় অনেকেই ছিলেন)। চোরবাগান বালিকা বিদ্যালয়ের বোর্ড অফ প্রিন্সিপালসের দ্বারা প্রকাশিত বঙ্গমহিলা পত্রিকায় বার্টির জীবন পরিচয় লিখতে গিয়ে লেখক তাঁকে রীতিমত সুনীতির পরাকাষ্ঠা হিসেবে দেখিয়েছেন—

যুবরাজ বাল্যকালে বার্‌চ, গিব্‌স, ফিশর, টরনর প্রভৃতি কয়েক জন পণ্ডিতের নিকট বিদ্যাভ্যাস করেন। পরে বয়ঃপ্রাপ্ত হইলে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করেন। তথা হইতে কেম্‌ব্রিজের বিশ্ববিদ্যালয়ে যাইয়া সেখানে তিন চারি বৎসর কাল অবস্থান করিয়া পাঠদ্দশা সমাপ্ত করেন। ভারতবর্ষীয় রাজকুমারগণ প্রায় সকলেই বৃথা আলস্যে ও বিলাসিতায় কালযাপন করেন। ইউরোপে সেরূপ দেখা যায় না, তথাকার রাজকুমারদিগকেও সামান্য বালকের ন্যায় বিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করিতে হয়।

বার্টি অলস বা বিলাসপ্রবণ নন, এই কথা শুনলে বার্টির মা মহারানি ভিক্টোরিয়া সম্ভবত বেশ আশ্চর্য হতেন। অবশ্য সদ্যশিক্ষিত পাঠিকাদের জন্য প্রকাশিত বঙ্গমহিলার পাতায় এ ধরনের উপদেশমূলক লেখা ছাড়া কিছু যে আদৌ পাওয়া সম্ভব ছিল, তা নয়— কিন্তু এ কথা লক্ষণীয় যে রাজপরিবারের প্রতি যে সমীহ ও উৎসাহ বঙ্গমহিলার পাতায় আমরা দেখতে পাই, সেটা আরও অনেক রাজভক্ত সংবাদপত্র ও পত্রিকায় প্রতিফলিত হত।

***

এমন সময়ে, ১৮৭৫ সালে, বার্টি বায়না করে বসলেন ভারত যাবেন। যেই বার্টিকে তিনি সরকারি কাগজ পর্যন্ত ছুঁতে দেন না, সেই বার্টি যাবেন ভারতে? আসলে মায়ের ছায়া থেকে বেরিয়ে এসে স্বতন্ত্র রাজনৈতিক সত্তা স্থাপনের প্রচেষ্টায় তখন তিনি যথেষ্ট পরিশ্রম করছেন, সফল ইউরোপ ও ইজিপ্ট সফরও করে ফেলেছেন। এবার তিনি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, ভারত সফরেই যাবেন। রাজপরিবারের প্রথম সদস্য হিসেবে ব্রিটিশরাজের মুকুটের শ্রেষ্ঠ রত্ন, অর্থাৎ, ভারতে গিয়ে তিনি নতুন নিদর্শন গড়বেন।

এ ক্ষেত্রে বার্টির কথাই রইল। মহারানি ভিক্টোরিয়া ছেলেকে ভারত সফরে যাওয়ার অনুমতি দিলেন, আবার দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সেই সিদ্ধান্ত নিয়ে ভীষণ দোটানায় পরে গেলেন! ১৮৭৫ সালে সুদীর্ঘ ৮ মাসের সফরে ভারতীয় উপমহাদেশে আসলেন সপার্ষদ যুবরাজ অ্যালবার্ট এডওয়ার্ড। ব্রিটিশ ঐতিহাসিকরা এই সফরকে বার্টির সাফল্য হিসেবেই দেখেছেন। রাজা-মহারাজাদের সাথে সাক্ষাৎ করে, হাতি ও বাঘ শিকার করে, ডিনার পার্টিতে তাঁর বিখ্যাত হাসিটি হেসে বার্টি বহু ভারতবাসীর মন জয় করেছিলেন। স্বল্প সমস্যা যে হয়নি তা নয়— ইংরেজদের মধ্যেই কোনও কোনও নিন্দুক যেমন বলেন, যুবরাজ যে উপহার পেয়েছেন ভারতীয় রাজাদের কাছ থেকে, আর যুবরাজ যে উপহার দিয়েছেন ভারতীয় রাজাদের, তার দামে আকাশ-পাতাল ফারাক! যদিও এ হেন নিন্দা ভাইসরয় সাহেব একেবারেই মেনে নিতে রাজি হননি। রাজতন্ত্র বিরোধী অনেক ইংরেজ বার্টির হাতি-বাঘ শিকারের ঘটারও সমালোচনা করেছিলেন। এ ছাড়াও অনেক সময় যুবরাজের খামখেয়ালিপনায় রাজসান্নিধ্য প্রত্যাশী অনেক ভারতীয় ক্ষুণ্ণ হয়েছিলেন। কলকাতাতেই যেমন লেডি ক্লার্কের ডিনার পার্টিতে যুবরাজ খেয়েদেয়ে উঠে মান্যগণ্য ব্যক্তিদের সাথে সময় না কাটিয়ে কমেডিয়ান চার্লস ম্যাথুজের সুন্দরী প্রাক্তন অভিনেত্রী স্ত্রী লিজির সাথে আলাপচারিতায় রাত দুটো অবধি মগ্ন থাকেন। রাজরোষের ভয়ে কেউ তাঁর সামনে যাওয়ার সাহস পাননি সেদিন, কিন্তু ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন নিঃসন্দেহে।

গণ্যমান্য ব্যক্তিদের ডিনার পার্টির ক্ষোভ অবশ্য সেইভাবে ভারতীয় কাগজপত্রে প্রকাশ পায়নি। বরং গাঁইগুই শোনা যায় যুবরাজের সফরের অহেতুক খরচের প্রসঙ্গে। অমৃতবাজার পত্রিকা যেমন এই বিষয়ে মাঝেমধ্যেই প্রশ্ন তুলে জানতে চায়, যুবরাজের সফরে ভারতবর্ষের আমজনতার কি খুব উপকার হবে? হলে তা কেমন হবে? এত খরচার আদৌ প্রয়োজন আছে কি? ওদিকে বামাবোধিনী পত্রিকার সম্পাদক উমেশচন্দ্র দত্ত যুবরাজের সফরের বিষয়ে উচ্ছসিত একটি লেখা লেখেন। প্রায় আজকের দিনের সেলিব্রিটি সফরের মতোই যুবরাজ কোথায় যাবেন, কী খাবেন, তাঁকে সম্মান করার জন্য কোথায় আতসবাজি জ্বালানো হবে এবং কোথায় খাওয়াদাওয়া হবে, সবেরই রুদ্ধশ্বাস বর্ণনা ছিল এই প্রতিবেদনে। পাঠিকারা (বামাবোধিনী মেয়েদের পড়বার জন্য প্রকাশিত হত) যাতে যুবরাজকে স্বচক্ষে দেখতে না পাওয়ার জন্য দুঃখ না পান, সেই জন্য তাঁর একটি পোর্ট্রেটও বামাবোধিনী-তে ছাপা হয়। তাঁদের পাঠিকারা যে চিঠি লিখে যুবরাজের আগমন প্রসঙ্গে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন, এ কথা জানাতেও ভোলেননি উমেশচন্দ্র। এ ছাড়াও পত্রিকার পাতায় প্রকাশিত হয় দুটো কবিতা, “উপহার” (হেমাঙ্গিনী দেবীর লেখা) এবং “যুবরাজ প্রিন্স অফ ওয়েলসের ভারতে আগমন” (বর্ধমানের নিরোদ মোহিনী মিত্রের লেখা)। পিছিয়ে থাকেনি বঙ্গমহিলাও। যুবরাজের পোর্ট্রেট-সহ পরিচয় ছাপা হয় সেখানেও, সাথে একটি দীর্ঘ কবিতা, “ভারতে কুমার”। কবির নাম অজানা।

বঙ্গমহিলার পাতায় যুবরাজ বন্দনা

উমেশচন্দ্র দত্ত বা ভুবনমোহন সরকার (প্যারীচরণ সরকারের ভ্রাতুষ্পুত্র, ১৮৭৫ সালে তাঁর মৃত্যুর পরে বঙ্গমহিলা সম্পাদনার দায়িত্ব নেন) যে এ হেন রাজভক্তি প্রকাশ করবেন, এতে সেরকম আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। গবেষক মনুজেন্দ্র কুণ্ডুর ভাষায়, শিক্ষিত সমাজে ও সংবাদপত্র-পত্রিকার জগতে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার জন্য এ ধরনের লেখাপত্র যে তাঁরা লিখবেন, এটা প্রত্যাশিত ছিল। তবে এ কথা কৌতুককর ঠিকই যে বামাবোধিনী বা বঙ্গমহিলার পাতায় যখন পাঠিকাদের নয়ন সুখপ্রাপ্তির জন্য সুপুরুষ যুবরাজের পোর্ট্রেট ছাপা হচ্ছে— হয়তো এই জেনেই যে তিনি নেহাতই বঙ্গললনাদের ধরাছোঁয়ার বাইরে— ঠিক সেই সময়েই মহারানি ভিক্টোরিয়া দুঃস্বপ্ন দেখছেন, এই বুঝি বার্টি মই বেয়ে কোনও রাজা-মহারাজার জেনানায় ঢুকে কেলেঙ্কারি বাঁধালেন! এই মন্তব্য লর্ড স্যালিসবারির, যার উপর দায়িত্ব পড়েছিল যুবরাজ ও তাঁর দলবলকে সদা ব্যস্ত রাখবার যাতে বার্টি কোনও কাণ্ড না ঘটিয়ে বসেন।

লিজি ম্যাথুজের সাথে কলকাতায় আলাপচারিতা, মেবেল ব্যাটেনের সাথে আগ্রায় সময় কাটানো, এরকম নেহাতই নিরীহ কিছু ঘটনা ছাড়া বার্টি যে কোনও বড়সড় কেচ্ছা ঘটাননি, অন্তত ইংরেজ ঐতিহাসিকদের চোখে, এ কথা নিঃসন্দেহ। এমনকি মহারানি নিজেও স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছিলেন যে বার্টির লেখা চিঠিগুলো পড়ে তিনি যথেষ্ট একঘেয়ে বোধ করেছেন, কারণ সেখানে কেবল ঘুরেফিরে “হাতি— ফাঁদপাতা— হীরে-জহরত— আতসবাজি”-র কথাই রয়েছে।

তাহলে কি সেরকম কিছুই ঘটেনি? না, ঘটেছিল তো বটেই— পাঠককে শুরুতেই বলেছি যে আমাদের কাহিনীর কেন্দ্রে একটি ছোটখাটো রাজকীয় স্ক্যান্ডাল। তবে এই ‘স্ক্যান্ডালে’র চরিত্র এমনই যে সেটা উনিশ শতকের কলকাতার চায়ের পেয়ালায় তুফান ছুটিয়ে দিলেও ইংরেজ ঐতিহাসিক বা সপ্তম এডওয়ার্ডের জীবনীকারদের কারও চোখে সেরকম গুরুত্বপূর্ণ ঠেকেনি।

ঘটনাটা এইরকম : যুবরাজ তাঁর ব্যস্ত কলকাতা সফরের ফাঁকেই আবদার করেন যে তিনি কোনও অভিজাত হিন্দু গৃহের অন্দরমহল দেখতে চান। সেই আবদার মেটাতে এগিয়ে আসেন ভবানীপুরের জগদানন্দ মুখোপাধ্যায়, সে সময় হাইকোর্টে সিনিয়র প্লিডার এবং ব্রিটিশ ইন্ডিয়া অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য, সমাজে গণমান্যদের একজন। মিস বেরিং, লেডি টেম্পলের মতন ইংরেজ মহিলাদের সাহায্যে যুবরাজকে আপ্যায়নের বন্দোবস্ত করা হয়, এবং জগদানন্দ মুখোপাধ্যায়ের বাড়ির মহিলারা শাঁখ বাজিয়ে যুবরাজকে অভ্যর্থনা করেন বলে জানা যায়। তাঁর এক অনামী জীবনীকারের ভাষায় বললে—

Perhaps the strangest place in which he ever found himself as a guest was the zenana of a high-caste native in India, a sanctuary within which no other white man has ever been permitted to set foot. His visit to this particular zenana was arranged with some difficulty, but it duly came off, and the Prince was immensely interested and impressed by all that he saw there.

(জীবনে যে সকল জায়গায় অতিথি হয়ে তিনি গিয়েছিলেন, তার মধ্যে সবথেকে অদ্ভুত হয়তো ভারতীয় এক উচ্চবর্ণের নেটিভের বাড়ির জেনানামহল। সে এক এমন নিভৃত স্থান যে সেখানে এর আগে আর কোনও শ্বেতাঙ্গ পুরুষ পদার্পণ করেনি। এই বিশেষ জেনানামহলে ওনার যাত্রা সংগঠন করতে বেশ বেগ পেতে হয়েছিল, তবে সেটা শেষমেশ হয়েছিল, এবং যুবরাজ সেখানে যা যা দেখেছিলেন তাতে তিনি বেশ মুগ্ধ হয়েছিলেন।)

হয়তো প্রথম শ্বেতাঙ্গ হিসেবে একজন অভিজাত নেটিভের জেনানামহল জয় করে বেশ কৌতুক বোধ করেছিলেন বার্টি, তবে এত ঘটনাবহুল একটি জীবন সম্পর্কে লিখতে গিয়ে ভবিষ্যৎ জীবনীকারেরা এত সামান্য ব্যাপারে সেরকম উৎসাহ নাও বোধ করে থাকতে পারেন।

আর তারপর?

সে প্রসঙ্গে আসছি, পরের অধ্যায়ে।

বসন্তক পত্রিকায় জগদানন্দ-যুবরাজ সমাচার

***

আগামী সংখ্যায় সমাপ্য

 

 

লোকাল ট্রেন । ১৯ জানুয়ারি, ২০১৯

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1024 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*