সময়-এর কবিতাই ফুটে উঠেছে নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর কলমে

নীরেন্দ্রনাথ

হিন্দোল ভট্টাচার্য

 

এখন আবার মনে পড়ছে।
প্রান্তরে জরায়ু-ভাঙা রক্তভ্রূণ,
শকুন! শকুন!
কয়েকবার পাখসাট মেরে ফের আকাশে উঠল!
করোটি, হাড়পোড়া, ধুলো –
চাপ চাপ জমাট রক্ত।

সুভাষের মতো প্রতিবাদ তাঁর কবিতায় প্রত্যক্ষতায় জ্বলে ওঠে না। তিনি প্রতীকের আড়াল নেন। প্রতীকের আলোয় সেই প্রতিবাদ হয়ে ওঠে অনেক বেশি শিল্পিত, অনেক বেশি প্রাণবন্ত। যেমন ‘উলঙ্গ রাজা’ কবিতা। সত্তরের দশকের রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস কবিসত্তাকে করেছিল বিচলিত। ক্ষমতাতন্ত্রের নির্বোধ ঔদ্ধত্যের নগ্ন প্রকাশ দেখে তাঁর অন্তরশায়িত প্রতিবাদী সত্তা পাশ্চাত্য মিথ কথার আড়াল রেখে সেই নগ্নতার স্বরূপ উন্মোচনে তাই তৎপর হয়ে ওঠে। এ-কালের শাসকের ক্ষমতার দম্ভের উলঙ্গ প্রদর্শনী তাঁর দৃষ্টিতে হান্স অ্যান্ডারসেন-সংকলিত কবিতায় উলিস্নখিত রাজার নির্বোধ আচরণের সঙ্গে এক হয়ে যায়। সেই রাজা দর্জির দ্বারা প্রতারিত হয়ে পোশাক না পরেই রাস্তায় বেরোন। এখনও মনে পড়ে সেই বিষণ্ণ বারান্দাটি। একটা গেট পেরিয়ে একতলাতেই ছোট বারান্দা। তার পর একটা দরজা। সেই দরজা খুলে ভিতরে কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর বসার ঘর। বসার ঘরের বাঁদিকেই তাঁর লেখার ঘর। বইবোঝাই। টেবিলেও নানান বই। লেখার খাতা। বাঙুরে ছোট্ট বাড়িটা ছিল একটা লম্বা রাস্তার শেষে। যেন রাস্তাটিও বৃদ্ধ হয়ে গেছে। বাঙুরের মূল রাস্তা থেকে হাঁটতে হাঁটতে সেই বাড়ি। সবকিছু থেকে অবসর নেওয়ার পরেই তাঁর সঙ্গে আমারযোগাযোগ। খুব যে বেশি গিয়েছি, তা নয়। কিন্তু যতবার গিয়েছি শুনেছি নানান গল্প। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল বার্ধক্য তাঁর কলমকে স্তব্ধ করতে পারেনি। নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর কবিতার সঙ্গে তো আলাপ সকলের মতো সেই ছোটবেলাতেই। যখন তাঁর উলঙ্গ রাজা পড়ে মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। কবিতার তথাকথিত কাব্যিকতার অলংকার সরিয়ে তিনি অনেক কবিতাতেই কথা বলে উঠেছেন। স্বতন্ত্র স্বর এবং ব্যক্তিত্বের যে স্পর্শ তাঁর কবিতাতে নিজের মতো করেই ছিল,  এ বিষয়ে সন্দেহ নেই। কয়েকদিন আগে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন- “জীবনানন্দ কিন্তু রবীন্দ্রনাথকে অস্বীকারও করেননি, নকলও করেননি, নিজে একটা আলাদা ভাষা, বলা ভালো নিজের ভাষা তৈরি করেছেন, যেটা তার পরে আমরাও করার চেষ্টা করেছি। আমার জীবনে, সত্যি কথাটা বলি তাহলে! আমি কি একটা মরা কাঠ! এই যে এইটের মতো! তা তো নয়। এই কাঠে মারলাম। এর সার নেই। সাড়া নেই। এ কারো দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছে না। কিন্তু আমি একটা মরা কাঠ না, আমি একটা জ্যান্ত গাছ। জ্যান্ত গাছ সবকিছুর দ্বারা প্রভাবিত হয়। রোদ্দুরের প্রভাব একটা জ্যান্ত গাছের ওপরে পড়ে। বৃষ্টির প্রভাব একটা জ্যান্ত গাছের ওপরে পড়ে। এই ছ’টা ঋতুর প্রত্যেকটার প্রভাব একটা জ্যান্ত গাছের ওপরে পড়ে। আমার ওপরে কার প্রভাব আছে যদি এই প্রশ্ন কেউ করেন, আমি তাকে পাল্টা প্রশ্ন করি, আমার ওপরে কার প্রভাব নেই ভেবে দেখুন। আমার জীবনে যাদের সান্নিধ্য সঙ্গে কথা বলে গেলেন, আমার গদ্য এত ভালোবাসেন বললেন, এই যে তুমি এত বড় প্রশ্নমালা নিয়ে, দীর্ঘ প্রস্তুতি নিয়ে আমার সঙ্গে কথা বলতে এসেছো, এরও প্রভাব আমার মধ্যে পড়ছে। আমার মধ্যে আমার অগ্রজ কবিদের প্রভাবও আছে। কিন্তু একজন কবির কাজ সেটাকে, সেই প্রভাবকে নিজের করে নেয়া। একটা গাছ যা করে, একটা জ্যান্ত গাছ।”

ব্যক্তিগতভাবে আমার মনে হয় এই ভাবনার মধ্যেই রয়েছে কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর কাব্যভাবনা এবং কাব্যব্যক্তিত্ব। তাঁর কাব্যভাবনাকে অনুসরণ করতে চাইলে হয়ত এই ভাবনার মধ্যে যে বীজ, তাকেই আমাদের অনুসরণ করা উচিত। একটি জায়মান মানুষ, জায়মান কাব্যভাষা, যা কোনও নির্দিষ্ট সময় বা নির্দিষ্ট ঋতু বা নির্দিষ্ট মতাদর্শ বা নির্দিষ্ট কাব্যভাবনা দ্বারাও প্রভাবিত হচ্ছে না। বরং সবকিছুকেই আপন করে নিজের কথা বলছে। ত্তরের দশকের রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস কবিসত্তাকে করেছিল বিচলিত। ক্ষমতাতন্ত্রের নির্বোধ ঔদ্ধত্যের নগ্ন প্রকাশ দেখে তাঁর অন্তরশায়িত প্রতিবাদী সত্তা পাশ্চাত্য মিথ কথার আড়াল রেখে সেই নগ্নতার স্বরূপ উন্মোচনে তাই তৎপর হয়ে ওঠে। এ-কালের শাসকের ক্ষমতার দম্ভের উলঙ্গ প্রদর্শনী তাঁর দৃষ্টিতে হান্স অ্যান্ডারসেন-সংকলিত কবিতায় উলিস্নখিত রাজার নির্বোধ আচরণের সঙ্গে এক হয়ে যায়। সেই রাজা দর্জির দ্বারা প্রতারিত হয়ে পোশাক না পরেই রাস্তায় বেরোন। তাঁর এই আচরণে নির্বুদ্ধিতার পরিচয় যেমন স্পষ্ট, তেমনি উচ্চকিত হয়ে উঠেছে তাঁর ক্ষমতার দম্ভের নির্লজ্জ প্রকাশ।

এমনটাই তো ঘটেছিল সত্তরের দশকে বাংলায়। এমন পরিস্থিতিতে গল্পে এক সরল সত্যবাদী শিশু ক্ষমতাতন্ত্রের এই নির্বোধ নগ্নতার স্বরূপ উন্মোচন করেছিল। কিন্তু এ-কালের নির্বোধ শাসকের অধঃপতনকে কে চোখে আঙুল দিয়ে দেখাবে? এ-কালের ক্ষমতাতন্ত্রের অধীশ্বর তো সংবাদপত্র থেকে কবি সবার কণ্ঠই রুদ্ধ করেছে। প্রতিবাদী মানুষদের গোপন স্থানে রেখেছে গুম করে। অন্যের উদাসীন অসহযোগিতায় হতাশ হয়ে কোনো প্রতিবাদী কণ্ঠ আবার হতাশায় চুপ হয়ে গেছে। ক্ষমতাতন্ত্রবিরোধী কবি সেই প্রতিবাদী মানুষের পুনরুত্থান কামনা করেছেন।

১৯৭৪ সালে যে কাব্যগ্রন্থের জন্য তিনি সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার পান, সেই গ্রন্থ, উলঙ্গ রাজা, প্রকৃত প্রস্তাবেই, একটি রাজনৈতিক কবিতার গ্রন্থ, যদিও সেই কবিতাগুলিতে স্পষ্ট রাজনৈতিক আলোকবর্তিকা নেই। তিনি এমন একজন কবি, যিনি তাঁর নিজের ভাষাতেই লিখে গেছেন বহুস্তরের ভাবনার কথা। যেন বা তিনি একজন আউটসাইডারের মতো দর্শক, আজীবন সেই শিশু, যে চুপ করে দেখে যে রাজা কেমন ভাবে উলঙ্গ। অথবা তিনি হয়ত সেই অমলকান্তি, যার রোদ্দুর হয়ে ওঠা হয় না কখনও। কিন্তু সে রোদ্দুর হতে চায়, আর সেই অমলকান্তি হতে চাওয়াই তাঁর ভিশন।

তাই তিনি লিখেছেন-

ভালো লাগলে কবিতায়
শুধু মনে রেখো,
মূল্য না দিয়ে আমি কিছু চাইনি।
আমি নিজে না কেঁদে অন্যকে কখনও –
কাঁদাইনি।

(‘ভালো লাগলে’, নক্ষত্র জয়ের জন্য)

রূপদক্ষ এই কবির কলমে যেমন ঝকমক করে উঠেছে চিত্রকল্প, তেমন-ই আখ্যান।

১)

মাথার উপরে আকাশ আজও
বৈদূর্যমণির মতো জ্বলজ্বল করছে।

(‘কালবৈশাখী’, উলঙ্গ রাজা)

২)

ঝকঝকে রুপো রঙের মস্ত একটা কইমাছের মতো
লাফিয়ে উঠবেন সূর্যদেব।

(‘রূপকাহিনী’, রূপকাহিনী)

সময় যে নিজের কথা বলে উঠেছে তাঁর কবিতায়, তার পরিচয় পাওয়া যায় নানাভাবে। কখনও প্রয়োজনে যেমন আলোর কথা বলেছেন, তেমন তুলে এনেছেন গ্রোটেস্ক-ও। যেমন-

১)

এ বড় তাজ্জব দিন।
শেয়ালে নির্ভয়ে এসে চেটে দেয়
শার্দূলের গাল, আর
নেপোরা অক্লেশে দই মেরে যায়।

(‘তাজ্জব’, আজ সকালে)

তাঁর অসামান্য সব কবিতাগ্রন্থগুলির মধ্যে রয়েছে অন্ধকার বারান্দা, উলঙ্গ রাজা, কবিতার বদলে কবিতা, কলকাতার যীশু, চল্লিশের দিনগুলি, জঙ্গলে এক উন্মাদিনী, পাগলা ঘণ্টি, সত্য সেলুকাস ইত্যাদি। আনন্দমেলার সম্পাদক হিসেবেও তিনি যে কাজ করেছেন তা অনবদ্য। পাশাপাশি বলতে হবে তাঁর অনুবাদের কথা। কবিতার পাশাপাশি তিনি যে অজস্ব ছড়া লিখেছেন তাও আমাদের মনে পড়ে।

উচ্চকিত কণ্ঠে না হলেও, আজীবন তিনি প্রশ্ন রেখে গেছেন তাঁর কবিতায়। প্রশ্নগুলির উত্তর তিনি খোঁজার চেষ্টাও করেছেন। কিন্তু সাধারণ মানুষের অনন্য গানের মতো সেই সব প্রশ্নের কোনও নির্দিষ্ট উত্তরের দিকে অগ্রসর হননি। দুদিকে উদ্যত মৃত্যুর মাঝখান দিয়ে টলোমলো পায়ে হেঁটে যেতে যেতেই তিনি থামিয়ে দিতে পারেন সমস্ত ট্র্যাফিক। যে মূর্ত মানবতার কথা তিনি বলেছেন তাঁর কলকাতার যীশু শীর্ষক কবিতায়, তা-ই যেন ছিল তাঁর কবিতার সঞ্চালক শক্তি। এ শক্তি যেমন বিস্ময়ের, তেমন-ই প্রশ্ন রেখে যাওয়ার। আর সভ্যতার ইতিহাস চিরকাল এই প্রশ্ন রেখে যাওয়াকেই সম্মান জানিয়ে এসেছে। আর এ কারণেই তিনি ছিলেন আমাদের কৈশোরের জনপ্রিয়তম কবি। পরে তো ঢুকেছি সুভাষে, জীবনানন্দে, বিনয়ে, আলোকে, শক্তিতে, প্রণবেন্দুতে। কিন্তু কৈশোরের নীরেন্দ্রনাথ ছিলেন চিরকাল মনের মধ্যেই।

একজন কবি চলে গেলেও কি আদৌ চলে যান? আমি যখন তাঁর সঙ্গে পরিচিত হয়েছিলাম, তখন তো আমি কিশোর। চিনতাম না তাঁকে, যেমন চিনিনি ব্যাসদেবকে, বোদলেয়রকে, জীবনানন্দ দাশকে, টি এস এলিয়টকে। অনেকেই হয়ত কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীকে চেনেন না। কিন্তু না চিনলেও হয়ত অনেকেই কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর কবিতার সঙ্গে সহবাস করেন। সেখানে কি তিনি জীবিত হয়ে থাকেন না? টলোমলো পায়ে হেঁটে যান না অনির্দেশ্য বিস্ময়ের দিকে?

দৃশ্যের ভিতর থেকে দৃশ্যের বাহিরে
প্রেমঘৃণারক্ত থেকে প্রেমঘৃণারক্তের বাহিরে
গিয়ে তোর শান্তি নেই, তোর
শান্তি নেই, তোর
ঘরের ভিতরে বড়ো অন্ধকার, বড়ো
অন্ধকার, বড়ো
বেশি অন্ধকার তোর ঘরের ভিতরে।

(‘একদিন, ততদিন’, নক্ষত্র জয়ের জন্য)

 

 

 

 

 

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1430 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...