আরএসএস-বিজেপির সাভারকরবাদ : সেকুলার আদর্শের সঙ্কট

আশীষ লাহিড়ী

 

ক্ষমতায় আসার পর থেকে গত চার বছর ধরে আরএসএস-বিজেপির রাজনৈতিক অ্যাজেন্ডায় হিন্দুধর্মের মোনোলিথিক নির্মাণ একটা বড়সড় জায়গা জুড়ে আছে৷ যা কিছু আরএসএস-সংজ্ঞায়িত হিন্দুত্বর আওতায় পড়ছে না, তা ভারতীয় নয়, এই কথাটা এত প্রকাশ্যে সরকারি ও বেসরকারি মঞ্চ থেকে এত প্রকটভাবে আগে কখনও প্রচারিত হয়নি। বড় বড় প্রতিষ্ঠানের মাথায় বেছে বেছে আরএসএস-এর লোক বসানো, গীতাকে ‘জাতীয় গ্রন্থ’র মর্যাদা দানের প্রয়াস, জনগণমন-র বদলে ‘বন্দে মাতরম’কে জাতীয় সঙ্গীত করার দাবি, হনুমান পূজা, রামনবমী, ইতিহাসের পাঠ্যবই সংস্কার, গোরুর মাংস খাওয়া নিয়ে আক্ষরিক মারমার-কাটকাট, বিভিন্ন স্থানের মুসলমান-গন্ধী নাম বদলে তথাকথিত ‘হিন্দু’ নামকরণ ইত্যাদি ও প্রভৃতি ঘটনার খবর আজকাল হামেশাই পাওয়া যায়। ভারতীয় বিজ্ঞান কংগ্রেসের মতো সম্মানিত মঞ্চও এই হানাদারি থেকে মুক্ত থাকতে পারেনি।

এর মধ্যে নির্বুদ্ধিতা যতখানিই থাক, সেই নির্বুদ্ধিতার মধ্যে কিন্তু ‘মেথড’ রয়েছে। হঠাৎ উত্তেজনার বশে কিছু পাগল এইসব কাজ করছে এমন মনে করার কোনও জায়গা নেই। কেননা এই সমস্ত কিছুকেই কিছু বিশেষ গোষ্ঠীর আর্থিক সুবিধার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে ‘সেকুলার’ অংশ ওইটুকুই— প্রকাশ্যে দেশের সাধারণ মানুষের পকেট-লুণ্ঠন।

ইদানীং লেফট লিবারেল বলে পরিচিত মহলে একটা প্রশ্ন প্রায়শই ঘোরাফেরা করছে— এই মুহূর্তে বর্তমান শাসকদল বিজেপি ও তার সাঙ্গোপাঙ্গরা যখন দেশজুড়ে হিন্দুধর্মের মনোলিথিক নির্মাণ ঘটাতে চাইছে, ও তার দ্বারা দেশের মানুষের প্রকৃত গুরুত্বপূর্ণ সমস্যাগুলোকে পেছনের সারিতে ঠেলে দিতে চাইছে, তখন তাদের তৈরি করা ধর্ম সংক্রান্ত ইস্যুগুলো নিয়ে কথা বলা মানে শাসকেরই তৈরি করা ফাঁদে পা দেওয়া নয় তো? তা যদি হয়, তাহলে এর সতর্ক প্রতিক্রিয়া কী হওয়া উচিত? ধর্ম সংক্রান্ত ইস্যুগুলো নিয়ে সমস্ত আলোচনা কি সচেতনভাবে বন্ধ করে দেওয়া দরকার, যাতে বিজেপি আসন্ন সাধারণ নির্বাচনের আগে এই বানিয়ে-তোলা ডিসকোর্সটাকে নিজেদের সুবিধেজনক পথে চালনা করতে না পারে?

এই সংশয়টার মোকাবিলা করা জরুরি। প্রথমত, এটা যে একটা ফাঁদ তা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই। তবে পাশাপাশি এই ফাঁদ সম্বন্ধে সচেতন থেকেই এই রাজনীতিটার বিরুদ্ধে কথা বলাটাও অত্যন্ত জরুরি। কারণ হিন্দুধর্মের মোনোলিথিক চেহারা দেওয়ার এই পরিকল্পনা একসময় আরএসএস-এর ‘হিডন অ্যাজেন্ডা’ ছিল বটে, কিন্তু আজ আর তা মোটেই হিড্‌ন নয়। আজ আরএসএস ঘোষিতভাবে ও সরাসরি এই কাজটা শুরু করে দিয়েছে। হিন্দু পুনরুত্থানবাদের ইতিহাস আমাদের দেশে বেশ পুরোনো, কিন্তু তার সঙ্গে আরএসএস-এর প্রকল্পিত যে হিন্দুত্ববাদ, তার গুণগত তফাত রয়েছে৷ কোনও ধরাবাঁধা ক্রিড না-থাকায় বহুরূপী  হিন্দুধর্মের মধ্যে স্বভাবত যে খানিকটা উদারতা ছিল, সেটাকে সম্পূর্ণ দূর করতে চাইছে আরএসএস। দামোদর সাভারকর হিন্দুত্বকে যেভাবে সংজ্ঞায়িত করেছিলেন, সেটা এক্ষেত্রে খুব গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেছিলেন, ভারতবর্ষের যে সকল অধিবাসী রক্তসম্পর্কের সূত্রে ভারতকেই তাদের পুণ্যভূমি বলে মানেন, যাদের তীর্থক্ষেত্র এই দেশের মধ্যে, একমাত্র তারাই হিন্দু ও এই ভূখণ্ডের একমাত্র দাবীদার; যাদের পুণ্যভূমি এই দেশের বাইরে, তারা নন। বৌদ্ধ, ব্রাহ্ম, বা শিখ, এদের সঙ্গে তাই সমঝোতা করা যেতে পারে; কিন্তু মুসলমান অথবা খ্রিস্টানদের সঙ্গে কোনও আপোষ  নয়। কারণ এদের পুণ্যভূমি ভারতের বাইরে, তাই তারা এদেশে থাকতে পারেন বটে, তবে তাদের হিন্দুদের পায়ের তলায় থাকতে হবে, কোনওভাবেই তারা হিন্দুদের সমান অধিকার পেতে পারেন না। সাভারকারের আগে আর কেউ রাজনীতিকে ধর্মের সঙ্গে মিলিয়ে হিন্দুত্বের এই ক্রিস্টালাইজ্‌ড্‌ চেহারাটা হাজির করতে পারেননি। হিন্দুধর্মের এই কেলাসিত ধারণাটিকেই আরএসএস এখন প্রকাশ্যে নিয়ে আসতে চাইছে। তাই আমি একে হিন্দুত্ববাদ না বলে সাভারকরবাদ বলব। আজ থেকে পঁচিশ বছর আগেও আমাদের দেশে কেউ ভাবতে পারত না যে বিজেপি ভারতে এমন শক্তিশালী ও নির্ণায়ক ভূমিকায় থাকবে, সাভারকরবাদ এতখানি জমি পাবে৷ তাই এই রাজনীতির অগ্রগমনকে প্রতিরোধ করার জন্যই এ নিয়ে আলোচনা জরুরি।

আরেকটি কারণে আজকের দিনে এই আলোচনা করাটা শুধু একটা ফাঁদে পা দেওয়া নয়। এইজন্য  নয় যে,  একে আমরা আমাদের দেশের বামপন্থার ব্যর্থতার দিক থেকেও দেখব। সম্প্রতি নেটে দার্শনিক-প্রাবন্ধিক রামকৃষ্ণ ভট্টাচার্য-এর একটা সাক্ষাৎকার শুনছিলাম, যেখানে উনি ভারতবর্ষে মার্ক্সবাদের সূত্রপাত ও বিকাশের ক্ষেত্রে অবদান আছে, এমন চারজন চিন্তকের নাম উল্লেখ করেছেন। সবচেয়ে প্রথমে ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত। তারপর, যথাক্রমে রাহুল সাংকৃত্যায়ন, দামোদর ধর্মানন্দ কোশাম্বি, ও সবশেষে দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়। এঁরা শুধুমাত্র তত্ত্বের দিক থেকে নয়, ভাবের দিক থেকে নয়, বা রোমান্টিসিজমের দিক থেকেও নয়, বরং সবটা মিলিয়ে একেবারে বাস্তবের মাটিতে দাঁড়িয়ে আমাদের দেশে মার্ক্সবাদের প্রয়োগ ঘটাতে চেয়েছিলেন। যাঁদের নাম করলাম, তাঁরা সবাই বিরাট মাপের মানুষ। পরবর্তীকালে এঁরা ছাড়াও তুলনায় ছোটখাট মাপের হলেও প্রচুর মানুষ এই নিয়ে কাজ করেছেন। নানা সময়ে নানা সামাজিক ইস্যুতে বামপন্থী আন্দোলনও খুব একটা কম হয়নি। তাহলে একটা প্রশ্ন উঠে আসবেই যে বামপন্থী চেতনা ও আন্দোলনের এত শক্তিশালী একটা ধারা আমাদের রাজ্যে ও দেশে থাকা সত্ত্বেও, আমরা এইভাবে ধর্মীয় দক্ষিণপন্থার আবর্তে এসে পৌঁছলাম কীভাবে?

শেখর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘কাস্ট, পলিটিক্স, অ্যান্ড দ্য রাজ’ বইটি এ ব্যাপারে বেশ সহায়ক। প্রথমেই উনি ভারতে জাতভিত্তিক সমাজের মধ্যযুগীয় ইতিহাসের কথা বলেছেন। তারপর দেখাচ্ছেন, ঔপনিবেশিক ভারতে, বিশেষ করে বাংলায় একটা ঘটনা ঘটল। ব্রিটিশদের হাত ধরে লিবারালিজমের একটা হাওয়া এল, সেই সময় একশ্রেণির মানুষ মনে করলেন, এই যে ধীরে ধীরে শিক্ষাদীক্ষা ছড়িয়ে পড়ছে, যুক্তিবাদেরও কিছুটা প্রসার ঘটছে, এই প্রবাহটা চলতে থাকলে এবং এর সঙ্গে মানুষের আর্থিক অবস্থার উন্নতি হলে, জাতপাত ব্যাপারটা ধীরে ধীরে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে আসবে। যাঁরা এইভাবে ভাবতেন তাঁরা এই ধারণার সপক্ষে দুটি প্রমাণ হাজির করেছিলেন। এক, তাঁরা দেখিয়েছিলেন যে সাধারণত শিক্ষা ও আধুনিকতা প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে পেশাগত ক্ষেত্রে আগে জন্মপরিচয় বা জাতিগত যে বাধা ছিল, সেটা ক্রমে শিথিল হয়ে এল। অর্থাৎ গুণ বা শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকলেই একজন ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার ইত্যাদি হতে পারে, তার জাতিপরিচয় বাধা হয়ে দাঁড়ায় না। মানুষ তার গুণের ভিত্তিতে নিজের পেশা নির্বাচন করতে পারে। খুব বেশি পরিমাণে না হলেও ব্রিটিশ আমলের গোড়ার দিক থেকেই এই প্রক্রিয়াটা শুরু হয়ে গিয়েছিল। দ্বিতীয়ত, আগে সমাজের দু-একটি জাতির হাতেই বেশির ভাগ ধনসম্পদ ছিল। ব্রিটিশ আমলে সমাজের অন্যান্য অংশের হাতে সে-সম্পদের ব্যাপকতর বণ্টন শুরু হল। এই দুটি ঘটনার ভিত্তিতে তখনকার দিনের লিবারালরা আশা করেছিলেন, এই প্রক্রিয়াটাই একসময় সমাজের প্রধান ধারা হয়ে উঠবে এবং ‘কাস্ট’ আস্তে আস্তে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়বে। আর তা যদি হয়, তাহলে হিন্দুধর্মের একটা প্রধান স্তম্ভ ভেঙে পড়বে।

কিন্তু বাস্তবে তা তো হলই না, বরং একেবারে উল্টোটা হল। ঠিক এই জায়গা থেকে শেখর বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর বইয়ে দেখাচ্ছেন যে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে অব্রাহ্মণ বা তথাকথিত ‘নীচুজাতের’ মানুষেরা শুধু যে  অংশগ্রহণ করেননি তাই নয়, এমনকি ক্ষেত্রবিশেষে বাধা দিয়েছিলেন। বস্তুত, তারা তাদের জাতপাতের ভিত্তিতে একটা মতাদর্শ তৈরি করে নিয়েছিলেন। তারা এতদিনের বঞ্চনার পর ব্রিটিশদের দৌলতে এই  নবলব্ধ আর্থিক সুযোগসুবিধা, শিক্ষাদীক্ষা, এগুলো আরও বেশি করে পাওয়ার চেষ্টা করলেন। সারাদেশে জাতভিত্তিক বিভিন্ন ছোটছোট সংঘ গড়ে উঠেছিল যারা শুধুমাত্র নিজেদের জাতের সুযোগসুবিধা আদায়ের জন্য কাজ করেছিল, জাতীয়তাবাদী আন্দোলন থেকে সচেতনভাবে দূরে সরে এসেছিল, এবং প্রয়োজনে ব্রিটিশদের সঙ্গে হাতও মিলিয়েছিল। ব্রিটিশরাও এই বিভেদটাকে সুকৌশলে নিজেদের কাজে লাগিয়েছিল, ঠিক যেমন মুসলিম বিভেদপন্থাকেও তারা অসাধারণ কৌশলে কাজে লাগিয়েছিল।

ঠিক একই চিন্তাভাবনা থেকে, বামপন্থীরা যখন আমাদের রাজ্যে শক্তি অর্জন করলেন, তারাও মনে করেছিলেন যে অর্থনৈতিক সংগ্রাম, রাজনৈতিক সংগ্রাম, প্রগতিবাদী চিন্তাভাবনা যত অগ্রসর হবে, ‘কাস্ট’ ব্যাপারটা ক্রমশ তত গুরুত্বহীন হয়ে পড়বে। মনে আছে, কোনও প্রশ্নের উত্তরে জ্যোতিবাবু তাঁর স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে বলেছিলেন, ওসব অন্য রাজ্যে হয়, এখানে ওসব জাতপাতের ব্যাপারস্যাপার নেই। কিন্তু এটা যে পুরোমাত্রায় আছে, হয়তো অন্যান্য রাজ্যের মতো অত প্রকটভাবে নেই, কিন্তু অন্যরূপে হলেও তলায় তলায় প্রবলভাবে আছে, সেটা অস্বীকার করার অবকাশ নেই। খুব উদারমনস্ক দু-চারটি পরিবার ছাড়া বৈবাহিক সম্পর্ক এখনও প্রবলভাবে জাতপাত-নিয়ন্ত্রিত।

এবং বিজেপি এই উপাদানগুলোকেই কাজে লাগাচ্ছে। দুইভাবে এই কাজটা চলছে, প্রথমত হিন্দুধর্মের মোনোলিথিক নির্মাণের প্রাথমিক লক্ষ্যটা তো আছেই, তার পাশাপাশি জাতপাতের বৈষম্যমূলক যে-বাতাবরণটা ইতিমধ্যেই ছিল, সেটাকে কাজে লাগিয়ে একটা প্রগতিবিরোধী আবহাওয়া তৈরি করার চেষ্টা চলছে। যেমন, খবরে জানতে পারছি এই মুহূর্তে সারা দেশে আরএসএস যেসব ইস্কুল তৈরি করছে যেখানে নিম্নবর্ণের ছেলেমেয়েদের জন্য অন্যবর্ণের ছেলেমেয়েদের থেকে আলাদা বসার ব্যবস্থা রয়েছে। নিম্নবর্ণের মধ্যে হিন্দুধর্মের একমাত্রিক রূপ অর্থাৎ ব্রাহ্মণ্যবাদকে নতুন করে ঢুকিয়ে দেওয়ার একটা চেষ্টা করা হচ্ছে। ঘটনাটা অদ্ভুত এই কারণে যে, নিম্নবর্ণের মানুষের তরফ থেকে তো আরএসএস-এর বিরুদ্ধে একটা স্বাভাবিক প্রতিরোধ আসা উচিত ছিল। কিন্তু সেটা বহু জায়গাতেই হচ্ছে না। এবং ঠিক এই জায়গাটায় বামপন্থীরা চূড়ান্ত ব্যর্থ। জাতপাতের এই প্রবণতাগুলির কথা তারা কখনও যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে ভাবেননি, কখনও তা নিয়ে যথেষ্ট কাজ করেননি। জাতপাতের এই ভিত্তিটা আমাদের রাজ্যে কেন রয়ে গেল, এ নিয়ে তারা কোনওদিন মাথা ঘামাননি, বরং চোখ বুঝে থেকেছেন। তারা ভেবেছেন প্রথাগত বামপন্থী আন্দোলনগুলো চালিয়ে গেলেই এইসব জাতপাতের ইস্যু দূর হয়ে যাবে। বাস্তবে তা কি হয়েছে? তা কোথাও হয়নি। এমনকি সাধারণ মধ্যবিত্ত শিক্ষিত তথাকথিত ‘এগিয়ে থাকা’ হিন্দু বাঙালিও যে আজও জাতপাতের নিয়মকানুন মেনে চলে, রবিবারের সংবাদপত্রে পাত্রপাত্রী-র বিজ্ঞাপনগুলিতে চোখ বোলালেই তা স্পষ্ট হয়ে যায়।

যদি শ্রমিক আন্দোলনের দিকে চোখ রাখি, সেখানেও অনেক শ্রমিকের মধ্যে এক অদ্ভুত দ্বিচারিতা চোখে পড়ে। যেমন আমাদের রাজ্যের চটকলে প্রচুর শ্রমিক ছিলেন, যারা অবাঙালি, অন্য রাজ্য থেকে, প্রধানত বিহার ও উত্তরপ্রদেশ থেকে এসেছিলেন। তারা অনেকেই এখানে শ্রমিক আন্দোলনে অংশ নিয়েছেন, কেউ কেউ তাতে বেশ জোরালো ভূমিকা নিয়েছেন। কিন্তু এরকম প্রচুর উদাহরণ আছে যে এইসব শ্রমিকরাই যখন অবসর নিয়ে নিজেদের গ্রামে ফিরে যাচ্ছেন, যেখানে তাদের কিছু জমি আছে,  সেখানে ভাগচাষিরা জন খাটে। অর্থাৎ এই শ্রমিকরাই জোতদার বা জমিমালিক হিসেবে একটা আধা-সামন্ততান্ত্রিক ভূমিকা পালন করছেন। সেখানে জাতপাত একটা প্রধান ভূমিকা পালন করছে। অর্থাৎ শুধুমাত্র শ্রমিক আন্দোলন জোরদার করলেই তাদের মধ্যে জাতপাত ও বৈষম্যমূলক উপাদানগুলি দূরে সরে যাবে, বামপন্থীদের এই চিন্তাভাবনা ভুল ছিল। তারা বাস্তবতাকে তলিয়ে দেখেননি। তাই আজ যখন আরএসএস শিবির দেশজুড়ে ধর্মীয় আগ্রাসন চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে, মানুষের ভেতরে কিন্তু এমন কোনও কাঠামো তৈরি নেই বা গড়ে দেওয়া যায়নি, যা দিয়ে সে এর পালটা প্রতিরোধ করতে পারে৷

যেমন, হাস্যকরভাবে, ভোটে বিজেপিকে ঠেকাবার জন্য তৃণমূল যেটা করছে, অর্থাৎ বিজেপি রামনবমী করছে বলে আমরাও আরও বেশি করে রামনবমী পালন করব, ওরা একটা হনুমানপুজো করলে আমরা দশটা হনুমানপুজো করব— এই রাজনীতিটাই মারাত্মক। তৃণমূল ভাবছে, বিজেপিকে যদি ভোটে হারাতে হয়, তাহলে বিজেপি যা-যা করে ভোট পেতে চাইছে, আমাকেও সেই কাজগুলো বেশি বেশি করে করতে হবে। আসল গলদটা এইখানে। বিজেপির যা রাজনৈতিক অ্যাজেন্ডা বা কর্মসূচি, সেই একই অ্যাজেন্ডা নিয়ে বিজেপির বদলে অন্য কেউ যদি ক্ষমতায় আসে, তাহলে আমাদের কি কোনও লাভ হবে? বিজেপিকে কীভাবে মসনদ থেকে দূরে সরিয়ে রাখা যায়, তৃণমূল, এমনকি বামপন্থীরাও শুধুমাত্র সেই কথাটাই ভাবছেন৷ অবশ্যই নির্বাচন একটা গুরুত্বপূর্ণ লড়াই। কিন্তু সবকিছুকেই শুধুমাত্র ভোটের নিরিখে দেখতে গেলে ভুল হবে। বিজেপিকে রুখতে হলে যে রাজনৈতিক ও মতাদর্শগত প্রতিরোধ জরুরি, এই কথাটা যেন আজকের দিনে তারা ভুলে গেছে। আর এইখানেই বিজেপির সবচেয়ে বড় জয়।

এবং এই সবকিছুর পেছনে জাতপাতের, যা ফলিত হিন্দুধর্মের প্রধান রূপ, একটা বড় ভূমিকা আছে, বহু বছর ধরে যেটাকে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছিল, আজ সেটাই বুমেরাং হয়ে ফিরে এসেছে। একটা জিনিস লক্ষ করার মতো, আজ যারা বীরভূম ইত্যাদি জেলায় তৃণমূলের প্রবল প্রতাপান্বিত নেতা, এরা কিন্তু নিম্নবর্ণ থেকেই উঠে এসেছেন। এটা একটা ঘটনা যে এরা উচ্চবর্ণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে আন্দোলনের মাধ্যমে এরকম একটা জায়গায় উঠে এসেছেন ও দাপটের সঙ্গে রাজনীতি করছেন। এই ধরনের উত্থানকে আমাদের স্বাগত জানানো উচিত৷ কিন্তু আদতে ঘটনা যেটা ঘটছে সেটা মোটেই স্বাগত জানানোর মতো নয়৷ নিম্নবর্গ থেকে উঠে এসে অনুব্রত মন্ডল উচ্চবর্ণের স্বরেই কথা বলছেন, বিজেপিকে রুখতে বিজেপির কায়দায় আরও বেশি করে পুজোআচ্চা করছেন, অর্থাৎ একজন নিম্নবর্ণের মানুষের হাতেই হিন্দুধর্মের ব্রাহ্মণ্যবাদী রূপটিরই নির্মাণ ঘটছে। এর চেয়ে দুঃখজনক আর কিছু হতে পারে না৷

পাশাপাশি দুঃখজনক হলেও এটা সত্যি যে আমাদের দেশে এখনও পর্যন্ত গভীরতর রাজনৈতিক ইস্যুভিত্তিক কোনও ভোট হয়নি। জনসাধারণকে কোনও একটা বুনিয়াদি রাজনৈতিক ইস্যুতে ব্যাপকভাবে জড়িয়ে নিয়ে ভোট হচ্ছে, এমনটা আমি মনে করতে পারছি না (এমার্জেন্সি কি এর ব্যতিক্রম?)। সাধারণভাবে মানুষের অর্থনৈতিক উন্নতি হবে, শ্রমিকদের মাইনে বাড়বে, কৃষকদের অবস্থার উন্নতি হবে, মধ্যবিত্ত ট্যাক্স ছাড় পাবে, এগুলো অবশ্যই দরকারি ইস্যু। বিক্ষিপ্তভাবে অপারেশন বর্গা ইত্যাদি কিছু ভালো কাজও হয়েছে। কিন্তু সবকাজই এমন ছোট গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ থেকে গেছে যে মুখ্য উদ্দেশ্য, অর্থাৎ সামগ্রিক চেতনার উন্নয়ন ও ক্ষমতার শ্রেণিগত হাতবদল, সেটা কোথাওই হয়নি। উপর উপর কতগুলো প্রসাধনী পরিবর্তন হয়েছিল মাত্র। তার ফলে যে-মুহূর্তে ওপরের নকল প্রলেপটা খসে গেছে, ভেতরের হতশ্রী চেহারাটা প্রকট হয়ে বেরিয়ে পড়েছে।

শ্রমিক আন্দোলন বলতে আমরা যা বুঝতাম, আজকের দিনে তার কোনও অস্তিত্ব নেই। পাশাপাশি, পুঁজিবাদের ধরনটাও এখন বদলে গেছে। কম্পিউটার-চালিত স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রনির্ভর যে-আধুনিক শিল্প সেগুলি আর ততটা শ্রমনিবিড় নয়। আগে বিষয়টা অন্যরকম ছিল। ফোর্ড কোম্পানিতে হাজার হাজার শ্রমিক একসঙ্গে কাজ করছেন, এই কাজ করার মধ্য দিয়ে যেমন তাঁদের কারিগরি দক্ষতার বিকাশ ঘটছে, ঠিক তেমনি তাঁদের মধ্যে এক ধরনের সংঘচেতনা বা ঐক্যের বোধ গড়ে উঠছে। এর ফলে শ্রমিকেরা এক অসাধারণ শক্তি অর্জন করছেন। আশা ছিল, একদিন এই সঙ্ঘবদ্ধ শ্রমিকশক্তি সমাজের অধিকারটা নিয়ে নেবে। কিন্তু আজ তো প্রায় বিপরীত জিনিস ঘটছে। আজ তথ্যপ্রযুক্তি, অটোমেশন ইত্যাদির ব্যাপক প্রসারের ফলে চিত্রটা বদলে গেছে। কারখানায় হাজার হাজার শ্রমিক একসঙ্গে কাজ করছে, চিমনি থেকে ধোঁয়া বেরোচ্ছে, এই ধরনের শিল্পের সংখ্যা ক্রমশ কমছে। ফলে শ্রমিকের সংঘচেতনা, যেটাকে মতাদর্শগত দিক থেকে আরও উন্নত জায়গায় নিয়ে যাওয়ার যে-সুযোগ আগে ছিল, সেটা আজ আর নেই। সুমিত সরকার তাঁর ‘মডার্ন টাইম্‌স’ বইতে লিখছেন, এই যে পুঁজিবাদের চরিত্রবদল, এটা কি প্রত্যাশিত ছিল? তাহলে এই নতুন ও পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে শ্রমিক আন্দোলনের চেহারাটা কেমন হবে? কারণ, যতই হোক, শ্রমিক শ্রেণির আন্দোলন ছাড়া কোনও কিছু দাঁড়াবে না। আমাদের মতো মধ্যবিত্তরা চারটি প্রবন্ধ লিখলে কোনওদিনই কোনও র‍্যাডিকাল পরিবর্তন হবে না! অথচ ট্র্যাডিশনাল শ্রমিক শ্রেণির সংখ্যা ক্রমশ কমছে ও যেসব শ্রমিক অবশিষ্ট আছেন, তাঁদের চরিত্র বদলে গেছে। কিন্তু এই যে বিজেপি দেশজুড়ে সাভারকারবাদের আক্রমণ নামিয়ে আনছে, তাকে ঠেকাতে গেলে তো শ্রমিকশ্রেণির আন্দোলন আমাদের দরকার।

প্রসঙ্গ উঠতে পারে, এই মুহূর্তে আমাদের দেশে তো দিকে দিকে কৃষক আন্দোলন দানা বাঁধছে। বিশেষ করে এই জমানায় যেখানে কৃষকরা বিশেষভাবে বঞ্চিত ও শোষিত, তাঁদের একজোট হয়ে পথে নামতে দেখছি আমরা। এটা নিঃসন্দেহে একটা খুশির খবর। কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে আমার মনে হয়, কৃষকদের নেতৃত্বে আনার কিছু সমস্যা আছে। কৃষকরা যেহেতু তাঁদের জমির সঙ্গে ও ট্র্যাডিশনের সঙ্গে অনেক বেশিমাত্রায় সম্পৃক্ত, আমার এরকম মনে হয়, তাঁদের খুব সহজেই ধর্মের দিকে টলিয়ে দেওয়া যায়। কারণ শ্রমিকদের মধ্যে তাও যেটুকু শ্রেণিচেতনা গড়ে উঠেছে, আমাদের দেশের শ্রমিকেরা যেটুকু বামপন্থী আন্দোলনের প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে গেছেন, কৃষকেরা সেই প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে ততখানি যাননি। দোষটা তাঁদের নয়, এখানেও আরেকবার আমাদের বামপন্থী দলগুলির ব্যর্থতার প্রসঙ্গ আসবে। কারণ তাদেরই তো কথা ছিল সাধারণ খেটেখাওয়া মানুষের মধ্যে এই প্রক্রিয়াটা চালু করবার। তারা তা করতে পারেননি।

ফলে আজ যে দেশ জুড়ে এই দক্ষিণপন্থার উত্থান হয়েছে, তা ওপর থেকে কেউ চাপিয়ে দেয়নি, এর একটা বাস্তব ভিত্তি রয়েছে। বিজেপি হঠাৎ একদিন উঠে এল, প্রচুর টাকা খরচা করল, আর সবাই তাকে সমর্থন করতে শুরু করল, ব্যাপারটা এত সরল নয়। দেশের কৃষকদের মধ্যে, নষ্ট হয়ে যাওয়া শ্রমিক আন্দোলনের মধ্যে এই দক্ষিণপন্থার জমি তৈরি হয়েই ছিল। এটা আমাদের বুঝতে হবে। জানি না আমরা এ থেকে কীভাবে বেরোতে পারব, তাই এ নিয়ে আমার বেশ অস্বস্তি হয়। কিন্তু সমস্যার এই চরিত্রটা আমাদের বুঝতে হবে। আর সমস্যাটা বুঝতে চাইলে আমাদের তা নিয়ে আলোচনাও করতে হবে। আর তাই, এই আলোচনাটা ফাঁদে পা-দেওয়া তো নয়ই, বরং ফাঁদ কেটে বেরোনোর পন্থা। এই ফাঁদ সম্বন্ধে আরও সচেতন হওয়ার জন্যই এই আলোচনাটা জরুরি।

এই আলোচনাও জরুরি যে খেটেখাওয়া মানুষের আন্দোলনের সঙ্গে কীভাবে সেকুলার চিন্তাভাবনা ও মতাদর্শকে যুক্ত করা যায়। যুক্ত করার পন্থাটা কী হবে সেটা নিয়ে তর্কবিতর্ক চলতে পারে। কিন্তু এটাকে যুক্ত করতে গেলে আগে মানতে হবে যে এটা বিযুক্ত হয়ে রয়েছে।

লোকাল ট্রেন । ১৯ জানুয়ারি, ২০১৯

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1024 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

1 Trackback / Pingback

  1. দ্বিতীয় বর্ষ, নবম যাত্রা : পিছু-হাঁটার এক বছর — ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*