নেয়ারের খাট, মেহগিনি-পালঙ্ক এবং একটি দুটি সন্ধ্যা

দীপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়

 

বাংলা সাহিত্যে দীপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ক্ষণজন্মা। যাপন, রাজনীতি ও লেখালেখি তাঁর কাছে তিনটি আলাদা শব্দ ছিল না। ষাট ও সত্তরের দশকে বিভিন্ন সংবাদপত্র ও সাময়িক পত্রে প্রকাশিত তাঁর রিপোর্টাজগুলি আমাদের ভাষা ও সমাজের স্থায়ী সম্পদ। বর্তমান লেখাটি মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যু ও শেষযাত্রা প্রত্যক্ষ বিবরণ। প্রকাশিত হয়েছিল কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ পত্রিকা একতা-য়। প্রকাশকাল আশ্বিন ১৩৬৪, সেপ্টেম্বর ১৯৫৭। পরবর্তীকালে, ২০০৬ সালে দীপেন্দ্রনাথের রিপোর্টাজগুলি একত্রে প্রকাশিত করেছেন একুশ শতক, অনিশ্চয় চক্রবর্তীর সযত্ন সম্পাদনায়। বানান অপরিবর্তিত।

ডিসেম্বর ২, ১৯৫৬

খাট থেকে ধরাধরি করে যখন নামানো হল, তখন দুটি চোখই খোলা। কপালের ওপর আর কানের পাশে কয়েকটা শিরা কুঁচকে উঠেছে। ডান হাতটা প্রতিবাদের ভঙ্গিতে একবার নাড়লেন। গলায় অস্ফুট শব্দ, যার কোনো ভাষা নেই, কিন্তু যন্ত্রণা আছে।

ডাক্তারিশাস্ত্র আমি জানি না, মনোবিজ্ঞানেও পারদর্শী নই। তবু খাট থেকে সেই বিরাট দেহটা যখন যত্ন আর পরিশ্রমে স্ট্রেচারে তোলা হল – তখন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের চোখ, গলা আর হাতের মিলিত অভিব্যক্তিকে আমার মনে হল – প্রতিবাদ। প্রতিবাদ আর ভাষাহীন যন্ত্রণা।

অথচ শুনেছি বিকেল থেকে তিনি অচৈতন্য। সন্ধ্যার সময় খবর পেয়ে যখন পৌঁছেছি, তখনও তাঁকে সজ্ঞানে দেখিনি। ছোট ঘর, চটের পর্দা দিয়ে কোনও রকমে পার্টিশন করা। ওপাশে বৃদ্ধ বাবা রোগশয্যায় শুয়ে, নীরবে। এ পাশে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় মৃত্যুশয্যায় পড়ে, নীরবে। একটা ভাঙা আলমারি, একখানা বুক সেলফ, একটি টেবল। অজস্র বই আর পত্র-পত্রিকা গাদা করা। কিছু চিঠি আর ছেঁড়া ছেঁড়া পাতায় লেখা খসড়া রচনা এখানে ওখানে গোঁজা। যেন কিছু সৃষ্টির বীজ হেলা ফেলা করা, ছড়ানো। টেবিলের ওপর কয়েকটা ওষুধের শিশি আর চীনেমাটির ওয়াটার বটল। জয়ন্তী সংকলন ‘পরিচয়’ এবং মলাট ছেঁড়া পুরনো ‘মৌচাক’-এর একটি বার্ষিক সংখ্যা বুক সেলফের ওপর এমনভাবে রাখা যে চোখে পড়বেই। মাথার কাছে বাড়ির বাসিন্দেরা দাঁড়িয়ে। কারোর মুখে কথা নেই, চোখে আশঙ্কা আর প্রশ্ন। ভাষাহীন প্রশ্ন। যা আমাদের গায়ে বিঁধছে, মাথা হেঁট করে দিচ্ছে।

পায়ের কাছে দাঁড়িয়ে নেয়ারের খাটটা এক মাথা শক্ত দু-হাতে চেপে ধরে আমি স্তম্ভিত বিস্ময়ে তাকিয়ে ছিলাম৷ লেপের তলায় সমস্ত শরীরটা ঢাকা। শুধু ডান হাতের কনুই থেকে কব্জি পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে। চওড়া হাতের ওপর মাংস নেই, মেদ নেই৷ শিথিল চামড়া। যেন আকাশের দেবতার ভ্রূকুটিতে সমস্ত সঞ্চয়কে শুষে নিয়েছে। দেখছিলাম মানিকবাবুর কপালে কী অজস্র জটিল আঁকাবুঁকি। মুখের এখানে ওখানে দু-একটা কাটা ফাটার চিহ্ন। মাথায় কদিন তেল পড়েনি জানি না, শুকনো চুলগুলো বালির মতো ঝুরঝুরে। পাক ধরেছে। আর, সেই আশ্চর্য চোখ দুটো বন্ধ।

এই অনুভূতিই আমাকে হতবাক করে দিচ্ছিল। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে আমি যাকে দেখছি, তিনি আজ চোখ বন্ধ করেছেন। সমস্ত বাংলাদেশ যে দুটোকে ভয় করত, শ্রদ্ধা করত, ভয় আর শ্রদ্ধা – সেই চোখজোড়ার পাতা এখন নামানো। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় আছেন, অথচ তাঁর চোখে দৃষ্টি নেই, হাতে সামর্থ্য নেই – এ কী বিস্ময়।

সেই আশ্চর্য মৃত্যুশয্যার পাশে দাঁড়িয়ে আমার কান্না পায় নি। অথচ বরানগরে ছুটে আসার সময় বারবার মনে হয়েছিল, হয়তো সইতে পারব না। হয়তো ভেঙে পড়ব৷ কিন্তু সেই আশ্চর্য মৃতুশয্যার পাশে দাঁড়িয়ে আমার কান্না পায় নি৷ আমি শুকনো দুটো চোখে কান্না আর জ্বালা, কান্না আর জ্বালা নিয়ে দেখছিলাম। অক্সিজেনের সিলিন্ডারটা খাটের তলায় শুইয়ে রাখা। সরু একটা রবারের নল বাঁ নাকের ফুটোয় ঢোকানো। শরীরের নাড়াচাড়ায় যাতে পড়ে না যায় তাই এক টুকরো প্লাস্টার দিয়ে নলটা গালের ওপর সেঁটে দেওয়া হয়েছে। মাঝে মাঝে ডান হাতটা অস্থির ভাবে নাড়ছেন। মাঝে মাঝে গলা দিয়ে কাতর শব্দ বেরুচ্ছে, যার কোনো ভাষা নেই কিন্তু যন্ত্রণা আছে।

আমি ভেঙে পড়িনি। সেই চতুষ্কোণ খাটে শোয়ানো মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের শরীরের দিকে তাকিয়ে আমি দেখছিলাম বাংলাদেশের চিহ্ন। মনের মধ্যে আবেগের ছিঁটেফোঁটাও তখন ছিল না। পোড় খাওয়া অকালবৃদ্ধ আর অভিজ্ঞ গাণিতিকের মতো আমি হিসেব কষছিলাম।

আসার পথে কী দেখেছি? দেশবন্ধুর কৌমার্যব্রতী শিষ্য বিধান রায়ের আলোকজ্জ্বল প্রাসাদ ওয়েলিংটন স্কোয়ারে বামপন্থীদের বৃহৎ নির্বাচনী সভা, রাস্তার দেওয়ালে হাঙ্গেরির গোলযোগের ওপর উত্তেজিত পোস্টার, কলেজস্ট্রীটে সারবাঁধা বইয়ের দোকান, সিনেমা হলের সামনে লম্বা লাইন আর পুলিশ। কী শুনেছি? দক্ষিণেশ্বরগামী কিছু বাসযাত্রীর পরলোকতত্ত্ব নিয়ে আলোচনা, খাবারের দোকান বা চায়ের স্টল থেকে হঠাৎ ছিটকে আসা দু-এক কলি চটুল বা গম্ভীর গানের সুর।

যা দেখেছি আর যা শুনেছি তার পরিপ্রেক্ষিতে আমি তাকিয়েছিলাম আমি মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দিকে, যিনি এখন চোখ বুজে। যা দেখেছি আর যা শুনেছি তার পরিপ্রেক্ষিতে আমি তাকিয়েছিলাম মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দিকে, যাঁর ডান হাতটা দুর্বলভাবে উঠছে আর নামছে। যা দেখতে আর শুনতে হয়েছে, সেই বিচিত্র পটভূমিতে দাঁড়িয়ে আমি তাকিয়েছিলাম মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দিকে, যিনি মরে যাচ্ছেন।

বোবার গানের মতো এই একটা কথা বারবার আমার মনে জান্তব আর্তনাদের আঁচড় কাটছিল, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় মরে যাচ্ছেন।

কী চিকিৎসা হয়েছিল, তার প্রমাণ পাচ্ছি টেবিলে ওষুধের শিশি কটা দেখে। কী পথ্যি তিনি পেয়েছেন, তার প্রমাণ মিলেছে বৌদির মুখের অসতর্ক একটি কথায়। সুভাষ মুখোপাধ্যায় মানিকবাবুর স্ত্রীকে অভিযোগ করে বলেছিলেন, ‘এমন অবস্থা আগে টেলিফোন করেন নি কেন?’ উত্তরে তাঁকে হাসতে হয়েছিল। আর তারপর অস্ফুটে বলে ফেলেছিলেন, ‘তাতে যে পাঁচ আনা পয়সা লাগে ভাই।’ মৃত্যুকালে বাংলাদেশ তাঁকে কী মর্যাদা দিল, তারও প্রমাণ আমরা বাইরের সাতটি মানুষ। অথচ নাকি লেখক, পাঠক এবং কৃষ্টি-কলার পৃষ্ঠপোষক সংখ্যায় আমরা ভারতবর্ষে অগ্রণী। আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি।

মিউনিসিপালিটির ভাঙা অ্যাম্বুলেন্স এল। যে মানুষটাকে খাট থেকে নামালে হার্ট ফেল করার সম্ভাবনা, তাঁকে এই গাড়িতেই নীলরতন সরকার হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। অর্থাভাবে ভাল গাড়ি আর মুরুব্বির অভাবে বড় হাসপাতালের ব্যবস্থা করা হয় নি। কলকাতার পথে পথে অসহায় দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় নাকি এখনও একটি পরশপাথরের সন্ধান করে বেড়াচ্ছেন।

ডাক্তারবাবু একটি ইনজেকসান দিলেন। চিকিৎসাশাস্ত্র আমার জানা নেই। অচৈতন্য মানুষের যন্ত্রণাবোধ আছে কিনা জানিনে। কিন্তু দেখলাম হাতের ওপর স্পিরিটমাখা তুলো ঘষতেই মানিকবাবু অল্প চোখ মেললেন। বিড়বিড় করে কী যেন বললেন। কথা, না গলার ঘড়ঘড়ানি তা বুঝলাম না। ইনজেকসান দেবার সময় ব্যথায় তাঁর সমস্ত শরীরটা মুচড়ে উঠল। চোখ দুটো খুললেন৷ তাতে যেন কিছুটা ভয়, কিছুটা বেদনা। ভয় আর বেদনা। তারপর ধরাধরি করে যখন তাঁকে স্ট্রেচারে তোলা হল, তখন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় তাকিয়েছেন। তাঁর চোখ, গলা আর হাতের মিলিত অভিব্যক্তিতে আমার মনে হল তিনি প্রতিবাদ করছেন। বাড়ি ছেড়ে যেতে কিংবা শেষ মুহূর্তে বাংলাদেশের সাতটি মানুষের সহায়তা গ্রহণ করতে।

প্রচণ্ড ঝাঁকুনি দিয়ে গাড়ি ছাড়ল। মেঝেতে স্ট্রেচারের ওপর তিনি শুয়ে। মাথার কাছে আমি। বুকের ওপর ঝুঁকে ডাক্তারবাবু। তাঁকে সমস্ত পথ পালস দেখতে হবে৷ বরানগরের দুটি তরুণ শক্ত করে অক্সিজেনের সিলিন্ডার ধরে। দরজার কাছে বেঞ্চির ওপর বসে আছেন বৌদি এবং সুভাষ মুখোপাধ্যায়। বৌদির হাতে চীনেমাটির সেই জলের পাত্রটা। সামনে ড্রাইভারের পাশে ‘স্বাধীনতা’র মণি ভট্টাচার্য। কলকাতা যাঁরা এসেছিলেন, তাঁরা বাসে ফিরবেন।

ড্রাইভারকে আস্তে চালাতে বলা ছিল। আস্তে আর সাবধানে। অথচ গাড়িটা প্রায় বাতিলের পর্যায়ে পড়ে। রাস্তাও খারাপ। থেকে থেকে ঝাঁকুনি লাগছে। সকলে একবার চমকে মানিকবাবুর দিকে তাকাচ্ছেন। তারপর ছোট্ট এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে মুখ ঘুরিয়ে নিচ্ছেন।

মৃত্যুর এত কাছে এর আগে আমি আসি নি। আমার শরীর, মন এবং অনুভূতির ওপর এত চাপও কখনো পড়ে নি। হাঁটু গেড়ে বসে দুটো হাত তাঁর কপাল, গাল, কখনও গলার খাঁজে শক্ত করে ছুঁইয়ে রেখেছিলাম। শুশ্রূষার আবেগে নয়, তিনি বেঁচে আছেন আর শরীরটা এখনও গরম – শুধু এটুকু উপলব্ধির স্বস্তি পাবার জন্য।

বরানগর থেকে মৌলালি। কী দীর্ঘ সেই যাত্রা আর কী ভয়ংকর। স্পষ্ট বুঝছিলাম আস্তে আস্তে তাঁর জ্বরতপ্ত শরীরের উত্তাপ কমছে। আর আহ, আমি বুঝছিলাম তিনি মরে যাচ্ছেন। নাড়ি ধরে মুখ নিচু করে বসে ডাক্তার কী ভাবছিলেন জানি নে। একটু উত্তাপের জন্য আমি কি প্রার্থনা করব? কিন্তু কার কাছে, কী ভাবে? আমি কি চিৎকার করে, চিৎকার করে ডাক্তারবাবুকে ধমকে উঠব? গাড়ি থামিয়ে একটা ইনজেকসান কেন দিচ্ছেন না, এই অজুহাতে? মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় মরে যাচ্ছেন, অথচ আমার কিছু করার নেই কেন?

মাঝে মাঝে তীব্র দৃষ্টিতে ডাক্তারের দিকে তাকাচ্ছিলাম। আমার চোখ জানতে চাইছিল, কী বুঝছেন? কিন্তু তিনি নির্বাক। আমার চোখ বলতে চাইছিল, সাবধান! কিন্তু তিনি নির্বাক। দেখলাম তাঁর কপালে কয়েকটা শিরা ফুলে উঠেছে, চোখের দৃষ্টি সংক্ষিপ্ত আর তীক্ষ্ণ, ডিসেম্বর মাসে ঝরঝর করে ঘামছেন। আমার কপালেও বিনিবিনি ঘাম। আবার গাড়িটা ঝাঁকুনি দিল। মনে হল একটা জন্তুর মতো চিৎকার করে, চিৎকার করে ড্রাইভারকে গালাগালি দি। কিন্তু তিনি নির্বাক। আর সত্যিই তো, ড্রাইভারের দোষ কোথায়?

হাতটা আর নাড়াচ্ছেন না। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত নিশ্চল হয়ে গেছে। শুধু মুখটা মাঝে মাঝে হাঁ করছেন নিঃশ্বাস নেবার অস্থির চেষ্টায়। মাঝে মাঝে যন্ত্রণায় অস্ফুট আর্তনাদ করছেন। কিছু কি বলছেন? কান পেতে শুনলাম – নাঃ নাঃ। কী না, কেন না, আমি জানি না। আমি জানি না। কিন্তু হাসপাতালে পৌঁছবার আগে আরও কয়েকবার মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় একইভাবে বলেছেন – নাঃ নাঃ।

গাড়ি ততক্ষণে বি টি রোডের মাঝামাঝি এসেছে। কানের পাশের শিরায় নাড়ির স্পন্দন অনুভব করা যায়, এ আমি দেখেছি। কিন্তু পাগলের মতো হাতড়েও মানিকবাবুর সেই শিরাটি খুঁজে পেলাম না। ডাক্তারকে বললাম, গাড়ি থামিয়ে পালসটা একবার দেখুন।

ডাক্তারবাবু সত্যিই গাড়ি থামাতে বললেন। রাস্তার মধ্যে হঠাৎ একটা অ্যাম্বুলেন্স দাঁড়িয়ে পড়ায় একজন পথচারী জানালা দিয়ে উঁকি মেরেই চলে গেলেন। আমার কেমন যেন হাসি পেল। হিংস্রতা আর কৌতুকভরা হাসি। লোকটা জানে না মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় মরে যাচ্ছেন। দিকে দিকে এত তুচ্ছ আর যেমনতেমন জীবনের টিকে থাকার ভাঁড়ামি, অথচ মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যু হচ্ছে।

লোকটা জানে না, কেউ জানে না। কিন্তু এই কলকাতা শহরেই বছর তিন চার আগে এমন একটি সন্ধ্যায় ইংলন্ডের রাণী এলিজাবেথের প্রথম ও নিরাপদ সন্তান প্রসবের খবর নিয়ে আমাদের জাতীয়তাবাদী কাগজগুলোর বিশেষ সংখ্যা বেরিয়েছিল।

ডাক্তারবাবু পালস দেখলেন। তারপর হাতল ঘুরিয়ে সিলিন্ডারে অক্সিজেনের চাপটা বাড়িয়ে দিলেন। বৌদির হাত থেকে জলের পাত্রটা চেয়ে মানিকবাবুর নাকের নল টেনে বার করে তার ভেতর চেপে ধরলেন। কী পরীক্ষা করলেন জানি না, শুধু দেখলাম জলের ভেতর মৃদু শব্দে বুদ্বুদ উঠছে। আর ততক্ষনে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ও প্রশ্বাসের আকুলতায় বুদ্বুদ হয়ে উঠেছেন।

আবার গাড়ি ছাড়ল। মাঝে মাঝে বৌদির দিকে তাকাচ্ছিলাম। পাথরের মূর্তির মতো বসে। চোখেমুখে ভাবাবেগের কোনও চিহ্ন নেই। এক দৃষ্টিতে স্বামীর দিকে তাকিয়ে আছেন। এমনকি একটিবার দীর্ঘশ্বাসও ফেললেন না। আমার কেমন যেন ভয় করছিল। ভয় আর অস্বস্তি। তাঁর দিকে চোখ তুলে চাইতে পারছিলাম না।

মাঝে মাঝে সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের দিকে তাকাচ্ছিলাম। বৌদির সঙ্গে নীচু গলায় হয়তো দুটো কথা বললেন। চোরের মতো একটি বার মানিকবাবুর দিকে তাকালেন। তারপর আবার তাড়াতাড়ি মুখ ঘুরিয়ে বাইরের দিকে চেয়ে বসে রইলেন। মনে পড়ল, হাসপাতাল এবং অ্যাম্বুলেন্সের সব বন্দোবস্ত করে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়কে স্ট্রেচারে তোলার সময়ে সুভাষ দূরে মুখ ঘুরিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। কিন্তু প্রতিবেশির বন্ধ দরজাগুলো ঠিক তখনই একটা করে খুলে যাচ্ছিল।

তারপর শ্যামবাজারের পাঁচমাথার মোড়। অনেক আলো, অনেক ভিড়, অজস্র কোলাহল। আলো আর ভিড় আর কোলাহল। কফি হাউস, কাগজের স্টল আর নিয়ন আলোয় কীসের যেন বর্ণাঢ্য বিজ্ঞাপন। হাত দেখিয়ে ট্রাফিক পুলিশ আমাদের সামনের কয়েকটা গাড়ির গতি রুদ্ধ করল। পাঁচ রাস্তার মোড়ের গোল চত্বরটার দিকে তাকিয়ে অবাক বিস্ময়ে আমার মনে পড়ল এই পৃথিবী সৌরজগতের একটি গ্রহ। তার ভেতর এশিয়া একটি মহাদেশ। তার বুকে ভারতবর্ষ একটি স্বাধীন প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্র। তার কোলে শহর কলকাতা – যার ইতিহাস আছে, ইতিহাস আর ঐতিহ্য। এবং যীশুখ্রিস্টের জন্মের পর মানুষের সভ্যতার বয়স হয়েছে এক হাজার নশো ছাপ্পান্ন বছর। আর আমার অসহায় দুটো হাত মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কপালে, গালে, গলায় এই মুহূর্তে উত্তাপ খুঁজছে।

আবার বিশ্রী ঝাঁকুনি শুরু হল। এই ঐতিহাসিক নগরীর সার্কুলার রোড রাস্তাতি যেন এত কদর্য, কোনওদিন তা নজর করে দেখবার প্রয়োজন হয় নি। এঁকে বেঁকে ট্রামলাইন গেছে। লাইনের ফাঁকে ইট অসমান। ঝাঁকুনির প্রকৃতি দেখে রাস্তার আকৃতি আন্দাজ করছিলাম। আমার সমস্ত ধৈর্য আর সহিষ্ণুতা শেষ বিন্দুতে পৌঁছেছিল। বারবার মনে হচ্ছিল আর উপায় নেই। আর থেকে থেকে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় সেই একই সুরে অস্ফুটে আর্তনাদ করে বলে উঠছিলেন – নাঃ, নাঃ!

গাড়ি যখন হাসপাতালে পৌঁছল, তখন মানিকবাবুর মুখও বন্ধ হয়েছে। আর তিনি কথা বলেন নি। শুধু মনে আছে এমার্জেন্সির টেবিলে পরীক্ষার পর যখন স্ট্রেচারে করে তাঁকে উডবার্নে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, তখন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাঁ চোখের কোণ থেকে এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ছিল। মানিকবাবুর কাভন্না। সমুদ্রের স্বাদ কিনা জানি নে। কারণ মনোবিজ্ঞানে আমার পারদর্শিতা নেই। হয়তো আগে যাঁদের দুর্জয় স্বাস্থ্য ছিল, মরার আগে স্নায়ুর দুর্বলতায় তেমন মানুষেরই চোখে জল আসে, হয়তো।

আর মনে আছে তারই কিছু পরে উডবার্নের বারান্দায় একটা কাঠের বেঞ্চিতে বসে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্ত্রী দেয়ালের দিকে তাকিয়ে স্বগতোক্তি করছিলেন: দুদিন আগে যদি আনা যেত, তাহলে হয়তো মানুষটা বেঁচেও যেতে পারতেন।

মনে হল বৌদি সব বুঝতে পারছেন। আমার কাছ থেকে চশমাটা চেয়ে নিলেন। বাড়ি থেকে বেরবার সময়ে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের খাপশুদ্ধ চশমাটা চশমাটা তিনি আমার কাছে রাখতে দিয়েছলেন। হয়তো তাঁর আশা ছিল হাসপাতালে মানিকবাবু সেরে উঠবেন। তারপর আবার চশমাটা পরে সেই আশ্চর্য চোখ দুটো মেলে তাকাবেন পৃথিবীর দিকে। হয়তো।

আমি ঠিক জানি না। আমাকে জানতে নেই। হয়তো।

ডিসেম্বর ৩, ১৯৫৬

পালঙ্ক সুদ্ধু ধরাধরি করে যখন ট্রাকে তোলা হল, তখন একটা চোখ খোলা, একটা বন্ধ। ঠোঁটের এক পাশ একটু যেন চাপা। এটা ঠিক হাসির ভঙ্গি নয়। কিন্তু আমার মনে আছে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাসির কয়েকটা ধরন ছিল। তা ছাড়া আধখোলা ডান চোখটার সঙ্গে সঙ্গতি রেখেই যেন ডান দিকের ঠোঁটে একটু চাপা হাসি।

শরীর উপর রক্তপতাকা বিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। তার ওপর ফুল। মুখটুকু বাদে সমস্ত শরীরটা ফুলে আর ফুলে ছেয়ে গেছে। উপছে পড়ছে দুপাশে। হু হু করে হাওয়া বইছে আর ধুনুচির ধোঁয়া জটিল রেখাচিত্রের মতো পাক খেয়ে চারপাশে অস্পষ্ট হয়ে মিলিয়ে যাচ্ছে।

আজকে ঝাঁকুনি লাগলে ক্ষতি ছিল না। কিন্তু লাগবে না। ট্রাকটা বড়, বড় আর পোক্ত। মধ্যিখানে সুদৃশ্য পালঙ্কের ওপর সেই মৃতদেহ। মাথা এবং পায়ের কাছে দেশনেতা, সাহিত্যিক। সামনে, পেছনে, দুপাশে বহু মানুষ। সর্বস্তরের মানুষ। মোড়ে মোড়ে ভিড়। সিটি কলেজের সামনে মাথার অরণ্য। কিন্তু কাল কেউ ছিল না, কিছু ছিল না।

বাংলাদেশটাকে আমি বুঝতে পারি না। হাত বাড়িয়ে বারবার ফুল নিচ্ছিলাম আর অবাক হয়ে, অবাক হয়ে, চারিদিকে তাকাচ্ছিলাম। দেশের জ্ঞানী, গুণী, আর সাধারণ মানুষের এই শোক, এই আবেগ যে কত অকৃত্রিম তা আমার সমস্ত অনুভূতি দিয়ে বুঝছি। কাল এমনি সময়ে অ্যাম্বুলেন্সে বসে বাংলাদেশকে আমি ঘৃণা করেছিলাম। আজ তাকে কী বলব। কাল কাঁদি নি, এখন আমার চোখে জল এল।

হঠাৎ গোপাল হালদার আঙুল বাড়িয়ে দেখালেন। ফুলের ভাঁড়ে দামী পালঙ্কের একটা পায়ে ফাটল ধরেছে। ভেঙে ভেতরের পেরেকটা অনেকখানি বেরিয়ে এসেছে। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পুরনো খাটটার কথা মনে পড়ল। শুনেছি নেয়ারের বাঁধন ছিঁড়ে গেলে তিনি নিজেই আবার তা বেঁধে-ছেঁদে নিতেন। খাটটার জীর্ণ অবস্থা নিজে দেখেছি। তবু তাতে মানিকবাবুর নিরাপদ আশ্রয় জুটত।

অথচ আজ এই নতুন, সুদৃশ্য পালঙ্ক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত শরীরের ভার বহন করতে পারল না। অবিশ্যি মানিকবাবুর ওজন কোনওদিনি এত ছিল না। জীবনে এত ফুলও তিনি পান নি।

আমি একা পারব না দেখে পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায় এবং গোপাল হালদার এসে দাঁড়ালেন। পায়ের দিকের পায়া দুটো ঠেলে ধরে রাখতে হবে। নইলে পালঙ্ক ভেঙে পড়বে।

হঠাৎ হাসি পেল। কাল এমনি সময়ে একটা ভাঙা গাড়ির বুকে বসে একটা জীয়ন্ত শরীরের উত্তাপ পরীক্ষা করছিলাম। আজ একটা পোক্ত গাড়ির বুকে দাঁড়িয়ে একটা পালঙ্কের আয়ু সামলাচ্ছি।

আজ কপালে ঘাম নেই, একটু যেন শীতও করছে। রাত হয়েছে। আজও দীর্ঘ পথের যাত্রা থেমে থেমে। তবে বরানগর থেকে মৌলালির হাসপাতাল নয়। মৌলালি থেকে নিমতলা শ্মশানঘাটে।

মনোবিজ্ঞানে আমার পারদর্শিতা নেই। তবু জানি মৃতদেহের ভাব, অভিব্যক্তি বলে মানুষ যা ভাবে, আসলে তা তা নিজেরই কল্পনা। তবু মনে হচ্ছিল মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় একটা চোখ মেলে তাকিয়ে যেন সব কিছুই দেখছেন। আর তিনি যে দেখছেন, তা তাঁর ঠোঁটের চাপা হাসির টুকরোয় গোপন করেও রাখেন নি। দেখা আর প্রকাশ – মৃত্যুর পরও মানিক বাঁড়ুজ্জের চরিত্র পাল্টায় নি।

লোকাল ট্রেন । ১৯ জানুয়ারি, ২০১৯

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1024 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*